চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। মানুষের ঢল নেমেছে মস্কোর কেন্দ্রে। ১৯৮৩ সালে মস্কো আসার
কয়েকদিন পরেই একটা মিছিলে গেছিলাম। শান্তির জন্য মিছিল। লোকে লোকারণ্য চারিদিক। এরপর
অনেক বার গেছি মে দিবস আর অক্টোবর বিপ্লব দিবসের ডেমনস্ট্রেশনে। সেখানে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকলেও এক ধরণের বাধ্যবাধকতাও ছিল। তবে এদিনের সমাবেশ ছিল
স্বতঃস্ফূর্ত। মানুষ প্রাণের টানে হাজির হয়েছিল সেখানে। হ্যাঁ, এরা ছিল মুক্তির স্বাদ পাওয়া
মানুষ। দীর্ঘ দিন সোভিয়েত শাসনের কড়া নজরে থাকার পর পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্তের যে
দমকা হাওয়া এদের জীবনে কিছুটা হলেও মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছিল সেই স্বাদটুকু ধরে রাখার
জন্য, আরও কিছুক্ষণ মুক্তির বাতাস বুকের ভেতর অনুভব করার জন্য এরা রাস্তায় নেমেছিল।
না, আমি বলছি না যে এর আগে তাদের স্বাধীনতা ছিল না। এদের অন্ন বস্ত্রের স্বাধীনতা ছিল,
শিক্ষা ও চিকিৎসার স্বাধীনতা ছিল, মাথার উপর বাসস্থান ছিল – কিন্তু এসব পাওয়ার পর তার
যে ভাবনার স্বাধীনতা দরকার, মুক্ত মনে জন্ম নেওয়া স্বাধীন চিন্তাকে আকাশের সীমাহীন
নীলে ভাসিয়ে দেওয়া দরকার – সেটাকে পাওয়ার স্বাধীনতা তার ছিল না। আর এ কারণেই সে সেদিন
জীবন বাজী রেখে নেমেছিল মস্কো, লেনিনগ্রাদ সহ বিভিন্ন সোভিয়েত শহরের রাস্তায়। এটা ছিল ১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট। হাজার হাজার মানুষের এই ভিড়ে আমিও ছিলাম সিন্ধুতে বিন্দুর মত। এখান থেকেই শুরু হবে নতুন ইতিহাস – জন্ম নেবে নতুন বিশ্ব, বিশ্ব ব্যবস্থা। আজ তিরিশ বছর পরে এসে সেই পরিবর্তনের সাফল্য, ব্যর্থতা নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়।
কথায় আছে «ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।» রুশরা বলে «একবার কাটার আগে সাতবার মাপ।» কথাগুলো বেশ পেসিমিস্টিক, তবে শেষ বিচারে এসবই ঠিক।
দেশে দেশে সাধারণ মানুষ, যাদের সব সময় জীবন মরণের কানাগলিতে পথ চলতে হয় – জীবন তাদের
এই শিক্ষাই দেয়, তারা সহজে পরিবর্তন চায় না। তারা জানে প্রতিটি পরিবর্তন তাদের অবস্থাকে
খারাপ থেকে খারাপতর করে আর তাদের কাঁধে বসে অতি আগ্রহী একদল মানুষ রাজপ্রাসাদে ঢুকে
দরোজা বন্ধ করে দেয়। তাই আজ তিরিশ বছর পরেও বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ সেই সময়ের জন্য
নস্টালজিক হলেও, সেই সময়ে না হোক, অন্তত পরস্পরের
মধ্যে সুসম্পর্ক আশা করলেও নষ্ট রাজনীতির খপ্পরে পড়ে দেশগুলো হয় পরস্পরের শত্রু। এটা ঠিক সে সময় অনেক কিছুই ছিল না। সমাজতন্ত্র মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারলেও সেটাকে এগিয়ে নিতে পারেনি। কেন? এখানেও তৈরি হয়েছে এলিট শ্রেণী যারা মানুষের কথা বলে ক্ষমতায় থাকলেও মানুষের জন্য যতটুকু না করলেই নয় সেটুকু করে নিজেদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর দিতেই ব্যস্ত থেকেছে। এক কথায় এখানেও মানুষের স্বাভাবিক লোভ লালসা কাজ করেছে। কিন্তু সমস্যা হল সমাজতন্ত্র সবাইকে একই রকম শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে কিন্তু ভাবতে দিতে চায়নি। অন্য দিকে পুঁজিবাদ শিক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষে মানুষে ভেদাভেদ গড়ে তোলে। সেখানে একদল মানুষ প্রচণ্ড ভাল শিক্ষা পায়, তারাই গঠন করে এলিট শ্রেণী। অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষ সাধারণ শিক্ষা লাভ করে কমবেশি ভদ্রস্থ জীবন যাপন করলেও ভোট দেওয়া বাদে দেশের নীতি কৌশলে খুব বড় একটা ভূমিকা রাখে না। যদিও আমেরিক্যান ড্রিম সবাইকে আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখায়, খুব কম মানুষই সেই স্বপ্নকে ধরতে পারে। এটা সেই প্রাচীন ভারতের
বর্ণ বিন্যাসের মত। যে জ্ঞানী সেই ব্রাহ্মণ, তবে জন্মগত ভাবে ব্রাহ্মণদের বাইরের কারও
পক্ষে সেই জ্ঞানের সনদ অর্জন প্রায় অসম্ভব। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ পুঁজিবাদের
এই ভেল্কি বুঝতে পারেনি। তারা একদিন যেভাবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেছিল, সেভাবেই গণতন্ত্রে
বিশ্বাস করেছে। আর যখন দেখেছে গণতন্ত্র স্বপ্ন দেখায় বটে তবে সেটা বাস্তবায়নের গ্যারান্টি
দেয় না, এমনকি মানুষের মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টিও দেয় না তাদের মনে আবার প্রশ্ন জাগে।
আগে মানুষের অধিকার কম থাকলেও সেটার কমবেশি গ্যারান্টি ছিল, এখন মানুষের অধিকার অনেক
কিন্তু তার কোন গ্যারান্টি নেই। প্রতিটি মানুষ শুধু নিজেই পারে নিজের চাহিদা পূর্ণ
করতে। সমস্যা হল, সবাই সেটা পারে না। অধিকাংশ মানুষই প্যাসিভ। তারা অল্পতেই খুশি ও
সুখি। কিন্তু সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ প্যাসসিওনারি বা প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ যারা লক্ষ্য অর্জনে পথ থেকে পাহাড় সরাতে প্রস্তুত। আর এরাই বার বার সমাজকে বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি করে। কিন্তু কিসের বিনিময়ে? হ্যাঁ, অনেক রক্ত আর লক্ষ মানুষের দুর্ভাগ্যের বিনিময়ে। যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা এই সমাজ, বিশেষ করে সামাজিক সম্পর্ক প্রচণ্ড জটিল। সেটাকে হুট করে ভাংলে সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়, সবই ক্ষতিগ্রস্থ হয় – অর্থনীতি, সামাজিক রীতিনীতি, আচার আচরণ, এমনকি মানুষের মানসিকতা। এবং সব সময় যে সেটা পজিটিভ হবে তার কোন কথা নেই। তাই আজ তিরিশ বছর পরেও দেখি অনেক রিপাবলিকই তাদের পথ ঠিক করতে পারেনি। অনেকেই বেছে নিয়েছে পরস্পর বিরোধিতার পথ। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, তাহলে ভারত বিভাগের পরিণাম থেকে এরা কিছু শিক্ষা নিলে নিতেও পারত, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা নয়, ভালবাসা আর সহজোগিতাই হত তাদের চলার পথে মূল মন্ত্র।
দুবনা, ১১ আগস্ট ২০২১
লেখাটি একটু পরিবর্তিত আকারে (শেষ কয়েক লাইন বাদ দিয়ে) ২২ আগস্ট ২০২১ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.ajkerpatrika.com/20805/

No comments:
Post a Comment