Tuesday, August 10, 2021

ফুসফুস

কয়েকদিন আগে যখন সাঁতার কাটতে  গেলাম দেখি এক বিশাল ইয়াখত দাঁড়িয়ে আছে নদীর ওপাড়ে।
- আব্রামোভিচ এসছে মনে হয়!
ঠাট্টা করে আমি জিজ্ঞেস করলাম। কে
শোনে কার কথা। ওরা এক মহিলাকে বলছে সবে কেনা গাউন পরতে। এত সুন্দর ইয়াখতের সাথে ছবি তোলা কি মিস করা যায়? কিন্তু গড়িমসি করতে করতেই সেটা দূরে ভেসে গেল। সবাই এবার আমার পেছনে লাগল।
- ইয়াখত গেছে তাতে কি, আ
মাদের বিদেশি আছে না?
- বিদেশী আছে, তবে সে পয়সা ছাড়া পোজ দেয় না, বিশেষ করে মেয়েদের সাথে। বউ সাবোটেজ করতে শুরু করলে তার মান ভাঙ্গাতে হবে না?

কিছুক্ষণ পরে দেখি সবাই কি একটা কাগজে সই করছে। আমাকেও বলছে সই করতে। কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?


ব্যাপার কিছুই নয়। আমরা যেখানে সাঁতার কাটি সেটা আসলে শহরের অনুমোদিত ঘাট নয়। তবে বাড়ির পাশে বিধায় এখানে অনেকেই সাঁতার কাটে। লোক কম। উজানে। নদীর তীর ধরে যে রাস্তা চলে গেছে সেটা ওদিকটায় সাজানো গছানো হলেও এদিকটায় তেমন নয়। আসলে এই এলাকার নামই নিষিদ্ধ এলাকা। বেশ কিছু টেকনিক্যাল বিল্ডিং থাকায় এখানে বেশি লোকজন চলাফেরা করুক সেটা কাম্য নয়। তবে সেটা ছিল সোভিয়েত আমলে। আমি আসার পর থেকেই এদিকে হাঁটছি, কোন অসুবিধা হয়নি। যাহোক এবার কর্তৃপক্ষ রাস্তাটা ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুবনার বয়স মাত্র ৬৫ বছর। গত ১৯৯৮ থেকে এরা শহরের জন্মদিন পালন করা শুরু করেছে। সেটা হয় জুলাইয়ের শেষ শনিবার। আর সেটাকে সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন অংশ নতুন করে সাজানো হয়, রাস্তাঘাট তৈরি হয়। বর্তমানের রাস্তা নির্মাণ সেই ঘটনার অংশ। কিন্তু নিয়ে ভাবার কী আছে? আসল ব্যাপার হল ওরা এখানে তরুণদের জন্য স্কেটিং করার পার্ক করতে চায়। তরুণদের এসব দরকার, নিয়ে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু কথা হল ওরা আসা মানেই আমাদের শান্তি নষ্ট হওয়া। ওরা তো শুধু স্কেটিং করে না, মিউজিক, হৈ হুল্লোড় সবই করে। আর এটা করতে গিয়ে নদীর ধারে বেশ কিছু গাছ কাটার প্ল্যান আছে বলে শোনা যাচ্ছে। তাই আমাদের প্রোটেস্ট। প্রতিবাদলিপি যাবে আমাদের ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর, শহরের মেয়র, মস্কোর জেলার গভর্নর আর প্রোসিকিটরের হাতে।

বছর ১৮-১৯ আগে, যখন বাচ্চারা ছোট ছিল, আমাদের বাড়ির সামনে একটা পার্ক তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কত যে গাছ গাছালি লাগানো হয়েছিল। কয়েক বছর ওখানে কেটেছে বাচ্চাদের সাথে ঘুরে ফিরে। তারপর একদিন দুবনার জন্মদিনের আগে ঠিক হল এখানে নয় অন্য একটা লেকের পাশে পার্ক হবে। এই পার্কের কাজ ওভাবে অসম্পূর্ণ পড়ে রইল। অযত্নে গাছগুলো বাড়তে লাগল। তারপর এক সময় কারা যেন সেখানে আবাসিক বিল্ডিং তোলার সিদ্ধান্ত নিল। বেড়া দিয়ে পার্কের একটা অংশ ঘিরে ফেলা হল। আমরা প্রতিবাদ করলাম। চিঠি লিখলাম। এখনও পর্যন্ত সেখানে সেই বেড়া রয়ে গেছে। যতদূর জানি বিল্ডিং করার উপর আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু বেড়া সরানোর অধিকার তার নেই। ফলে এটানা ঘরকা না ঘাটকা তাই শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেই প্রতিবাদলিপিতে সই করলাম। হোক বা নাই হোক, প্রতিবাদ করার অধিকারটুকুই বা কম কোথায়?  সোভিয়েত আমলে আমরা কি এটা কল্পনা করতে পারতাম?


কথাটা মনে পড়ল দেশের এক প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে ঘর আর ঘর আর তার মাঝে দু একটা গাছ। দুবনায় তার উল্টো। বন আর বন, মাঝে মধ্যে দু একটা বিল্ডিং। তবুও গাছের জন্য মানুষের এই লড়াই।

বিগত কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় নতুন হাসপাতাল নির্মাণ নিয়ে তোলপাড় চলছে। এই এলাকাকে চট্টগ্রামের ফুসফুস বলা হয়। থেকে বুঝতে পারি এখানে পার্ক বা উদ্যান, নিদেনপক্ষে অনেক গাছপালার উপস্থিতি। এই গাছপালা কাটা মানে সেই ফুসফুসকে নষ্ট করা। করোনা যেমন মানুষের ফুসফুস আক্রমণ করে প্রশাসন তেমনি শহরের ফুসফুস ধ্বংস করতে উদ্যত। হাসপাতাল রোগ সারায়, বন, প্রকৃতি রোগ হতে দেয় না। তাই যেকোনো দেশেই উদ্যানের প্রয়োজন হাসপাতালের চেয়ে কম তো নয়ই, ক্ষেত্র বিশেষ অনেক বেশি। উদ্যান কেটে হাসপাতাল নির্মাণ করলে সমস্যার সমাধান হবে না, সমস্যা বরং বাড়বে। তাই হাসপাতাল দরকার পার্কের পরিবর্তে নয়, পরিপূরক হিসেবে। যত তাড়াতাড়ি দেশের মানুষ, প্রশাসন, এই সহজ সত্যটা অনুধাবন করতে পারবে ততই মঙ্গল।

দুবনা, ১৬ জুলাই ২০২১

লেখাটি ১০ আগস্ট ২০২১ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়

https://www.ajkerpatrika.com/13391  
 



 

 

No comments:

Post a Comment

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...