অনেকদিন
পরে ভালোদিয়ার সাথে দেখা। ও আমার ল্যাবেই কাজ
করে। আমার ছবির অনুরাগী।
- ভ্যাকসিন নিয়েছ?
- না, এখনও নিইনি। আমার তো করোনা হয়েছিল, তবে ক' দিনের মধ্যেই নেব।
এ এক নতুন বাস্তবতা। কেউ আর কেমন আছ জিজ্ঞেস করে না, যেন ভ্যাকসিন ছাড়া ভাল থাকা যায়
না।
- তুমি যে বেঁচে আছ তা দেখে খুব ভাল লাগছে।
আমি বুঝলাম ও আমাকে কিছুদিন আগে মারা গেছে
এমন একজনের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। আসলে আমাদের আসল পরিচয় গায়ের রঙে বা দেশের নামে। আমারও
এমন হয়, অনেককে নামে চিনি, অনেককে মুখে। খুব কম মানুষকেই নামে ও মুখে চিনি। তাই কেউ
মারা গেলে কত মুখ যে চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়!
- কি আর করা? কেউ বাঁচবে, কেউ মরবে। সময়ই এমন।
- কারমা (ওরা কর্মকে কারমা বলে)। ওর কারমা ছিল এখানে এভাবে মরার, তাই মরেছে।
- দেখ তোমরা অনেক কিছুর অর্থ না বুঝেই এসব বল। জান কর্ম কি?
- এটা সেই শক্তি যা আমাদের জীবনের ভালমন্দ নির্ধারণ করে, যার হাত থেকে মুক্তি নেই।
- শোন, আমি শত হলেও উপমহাদেশের লোক। কর্ম – এর মূল অর্থ হল কাজ, অ্যাকশন। জানই তো আমি
কসমোলজির উপর কাজ করি। আমাদের বর্তমান বলে কিছু নেই। সেটা একটা ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত।
অতীত থেকে সময় অনবরত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেই সাথে আমরাও। এই যে আমরা এখন এখানে
সেটা আমাদের অ্যাকশনের ফল। আমরা অফিস থেকে হাঁটা শুরু করেছি আর তার ফলে এখানে এসেছি।
এভাবে ভাবলে দেখবে আমাদের প্রতিটি বর্তমান, তথা ভবিষ্যৎ আমাদের অতীত কর্মের ফল। এটাই
কর্মের মেসেজ। শুধু কিছু মানুষ অন্য ভাবে এসব ব্যাখ্যা করে সাধারণ মানুষকে ঠকায়। তাই
কর্মের কথা না ভেবে মনের আনন্দে কাজ কর, নিজের কাজ উপভোগ কর। দেখবে তাহলেই ফল আসবে।
- আমি ২৮ বছর এসব নিয়ে পড়াশুনা করছি...।
- তুমি সারা জীবন এ নিয়ে পড়াশুনা করতে পার। যদি খোলা মনে না দেখে এসব ডগমা হিসেবে নাও,
কোন লাভ হবে না। তুমি না বিজ্ঞানী! প্রশ্ন করতে শেখ। যাকগে তুমি ভ্যাকসিন নিয়েছ?
- না। আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই আমাদের ভ্যাকসিনের উপর।
- দেখ, ভ্যাকসিন তৈরি করছে বিজ্ঞানীরা। রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস না করতে পার, কিন্তু
বিজ্ঞানকে তো ফেলতে পার না।
- আমার ধারণা, আমাদের আমলারা নিজেরা বিদেশি ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের এসব দিচ্ছে।
আসলে সোভিয়েত আমলে ও পরবর্তী কালে আমলাদের উপর এমন এক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে উপর থেকে
কিছু বললেই এরা সতর্ক হয়ে যায়, ভাবে আবার কোন ফন্দি আঁটছে কিনা।
- সেটা বুঝলাম, তবে এই যে এত লোক মারা যাচ্ছে সেটা তো অস্বীকার করতে পার না। তাহলে
ভ্যাকসিন নিতে সমস্যা কোথায়? পরিচিত কত লোকই তো নিচ্ছে। তাদের তো সমস্যা হচ্ছে না।
- আমার মনে হয় না করোনায় এত মানুষ মারা যাচ্ছে।
- মানে?
- অন্য কোন কারণে মারা গেলেও ডাক্তাররা রিপোর্টে লেখে করোনায় মারা গেছে। তাতে ওরা এক্সট্রা
পয়সা পায়।
- বল কী? আমি কিন্তু হাসপাতালে ছিলাম। ডাক্তারদের চিকিৎসার কোন ত্রুটি দেখিনি।
- আমার শ্বশুর হাসপাতালে কাজ করে। তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করে রোগীকে সাহায্য করতে।
- তাহলে?
- সবাই তো এক রকম নয়।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। আসলে অবিশ্বাস যখন খুব গভীর হয় তখন মানুষ নিজের ভালমন্দও বোঝে
না। তবে মৃত্যুর সামনে সব সাহস কর্পূরের মত উবে যায়। অনেক আগে ভ্যাকসিন বাজারে এলেও
কেউ তেমন একটা গা করেনি নেওয়ার। এখন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ক্ষতি যা হবার
হয়ে গেছে। ভাল হত যদি বাইরের ভ্যাকসিন এখানে নিয়ে আসত। নিজেদের ভ্যাকসিন আগের মতই ফ্রি
আর বাইরের ভ্যাকসিন টাকার বিনিময়ে। যাদের যেটা খুশি নিত, অন্তত তাতে ভ্যাক্সিনিটেড
লোকের সংখ্যা বাড়ত। যদিও সারাবিশ্বেই ভ্যাক্সিন আশানুরূপ কাজ করছে না, মানে আমেরিকা সহ অনেক দেশেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরির উপযোগী সংখ্যক মানুষ ভ্যাক্সিন নেবার পরেও সংক্রামণ বাড়ছে, আর জামা কাপড় বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মডেল বদলানোর মতই করোনা ভাইরাসও রূপ বদলিয়ে ভ্যাক্সিনের ফেস কন্ট্রোল এড়িয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ছে, তবুও স্বীকার করতেই হবে এখনও পর্যন্ত ভ্যাক্সিনই করোনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা। তবে ভ্যাক্সিনের সাথে সাথে মাস্ক পরা,
সামাজিক দূরত্ব এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও প্রয়োজন। ভ্যাক্সিনকে করোনার বিরুদ্ধে সর্বশক্তিমান মনে করলে সেও ঈশ্বরের মতই অসহায় হয়ে পরবে। তাই ভ্যাক্সিনে বিশ্বাস রেখে ভ্যাক্সিনকে সাহায্য করতে হবে করোনার বিরুদ্ধে চলমান মুক্তি সংগ্রামে।
লেখাটি ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.ajkerpatrika.com/29038/

No comments:
Post a Comment