ইউক্রেনের সাথে রাশিয়াকে যুদ্ধে নামানোর আমেরিকান প্ররোচনার অনেকগুলো কারণের একটি ছিল নর্থ স্ট্রীম -২। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে জার্মানি আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে গ্যাস সরবরাহের চুক্তি হলে আমেরিকা এর বিপক্ষে ছিল কেননা সোভিয়েত ইউনিয়নের সস্তা গ্যাস জার্মানির শিল্প বিকাশে ও আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার পথ খুলে দেয়। ফলে যখনই রাশিয়া ও জার্মানির সাথে কোন রকম অর্থনৈতিক, বিশের করে তেল ও গ্যাসের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে তখনই বিভিন্ন ভাবে সেটা বন্ধ করার চেষ্টা করেছে আমেরিকা। নর্থ স্ট্রীম – ১ ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু তখন জার্মানির শাসকেরা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছেন আর তার ফলে সে সময় পাইপ লাইন তৈরি হয়েছে বাল্টিক সাগরের নীচ দিয়ে। ইউক্রেন আর বেলারুশ সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ বিধায় সে সময় পাইপ লাইনগুলো এসব দেশের উপর দিয়েই তৈরি করা হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কী ইউক্রেন, কী বেলারুশ সুযোগ পেলেই ট্র্যানজিট নিয়ে ঝামেলা করত, এমনকি, বিশেষ করে ইউক্রেন, ইউরোপের অন্য সব দেশের জন্য সরবরাহকৃত গ্যাস চুরি করত।
শিল্পের বিকাশের ফলে ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি আরও বেশি বেশি গ্যাস কিনতে শুরু করে আর এ জন্যে আর ট্র্যানজিটের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাবোটেজ মিনিমাইজ করতে বাল্টিক ও ব্ল্যাক সীর নীচ দিয়ে যথাক্রমে নর্থ ও সাউথ স্ট্রীমের প্রকল্প গ্রহণ করে রাশিয়া। অন্য দিকে শেল গ্যাসের উৎপাদন বাড়লে আমেরিকাও ইউরোপের বাজারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এক সময় বুলগেরিয়ার মাধ্যমে সাউথ স্ট্রীমের কাজ স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু জার্মানি নিজের স্বার্থে নর্থ স্ট্রীম কিছুতেই বন্ধ করতে রাজি হয় না। ফলে দরকার ছিল এমন কিছু করা যাতে এই প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে যায়। তাই রাশিয়াকে যুদ্ধে নামানো হয়। এছাড়া বাইডেন হুমকি পর্যন্ত দেন যে নর্থ স্ট্রীম – ২ কিছুতেই চালু হতে দেবেন না।
২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নর্থ স্ট্রীমে সন্ত্রাসী হামলা হয়। এর অর্থনৈতিক ও ইকোলজিক্যাল ক্ষতি অপরিসীম। এর ফলে ঐ এলাকার সামুদ্রিক প্রাণীর অর্ধেক ধ্বংস হয়েছে। পরিবেশের উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তবে এ নিয়ে পরিবেশবাদীদের মাথা ব্যথা নেই। কারণ ওয়াশিংটন থেকে অর্ডার আসেনি। প্রবলতার দিক থেকে এটা টুইন টাওয়ারের বিস্ফোরণকে ছাড়িয়ে গেছে।
ঘটনার পর পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উপর দায়িত্ব চাপানোর চেষ্টা করেছে। ইউরোপকে গ্যাস থেকে বঞ্চিত করতে রাশিয়া নিজেদের পাইপ লাইন নিজেরাই ধ্বংস করেছে। তবে যুক্তিবাদী মানুষ সেটা প্রত্যাখান করেছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ হবার ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে আমেরিকা। রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার পাশাপাশি জ্বালানি যোগ হওয়ায় আমেরিকার উপর ইউরোপের নির্ভরতা আরও বেড়েছে। ফলে এই হামলার পেছনে আমেরিকার স্বার্থ ও হাত দুটোই জড়িত - এমন ভাষ্য আগেই ছিল।
কিছুদিন আগে পুলিৎসার বিজয়ী সাংবাদিক সেইমুর হেরস দাবি করেছেন যে বাইডেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সার্কেল এই সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত। তিনি তথ্য প্রমাণসহ এই অভিযোগ তুলেছেন, যদিও কে তাঁকে এই খবর দিয়েছে সেটা প্রকাশ করেননি। আমেরিকা সেটা স্বাভাবিক কারণেই অস্বীকার করেছে। কিন্তু দু'দিন আগে তারা ইউক্রেনকে দোষী করেছে। বলেছে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী এক বা একাধিক গ্রুপ এর সাথে জড়িত। তবে তাদের সাথে জেলেনস্কির সম্পর্ক নেই। বাইডেন নিজেও এই সমর্থনকারীদের একজন। আজ আমেরিকা জানালো অনেক আগেই তাদের কাছে এসব তথ্য ছিল, তারা এমনকি হামলার আগে জার্মানিকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল। এসব থেকে একটা সত্যই বেরিয়ে আসে – অনেক কিছুর মতই মিথ্যে বলাতেও আমেরিকা আজকাল খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না, মিথ্যেটাও দুই নম্বরী হয়ে যাচ্ছে। একেই বলে পতন।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১৬ মার্চ ২০২৩ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.ajkerpatrika.com/263630/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%AE%E0%A6%BE
Thursday, March 16, 2023
Friday, March 10, 2023
মাস্টারদা
রুশরা বলে কেউ মারা গেলে তাঁর সম্পর্কে হয় ভালো বলতে হয় নয়তো কিছুই বলতে হয়না। তবে আমি দেখেছি মানুষের মৃত্যুর পরে আমি তাঁদের সম্পর্কে অনেক নতুন কিছু জেনেছি, নতুন করে তাঁদের আবিষ্কার করেছি। দেশে যতদিন ছিলাম, বলতে গেলে পরিচিত কেউই মারা যান নি। যুদ্ধের আগে আগে এক ঠাকুরমা মারা যান। তবে উনি অসুস্থ ছিলেন বিধায় তাঁর সাথে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাঁর মৃত্যুও তাই কোন প্রভাব ফেলে নি। এরপর মস্কো আসি। ছাত্র জীবনে যত না শিক্ষক মারা গেছেন তার চেয়ে বেশি মারা গেছেন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। ফরহাদ ভাই, ওয়াজেদ আর দু একজন প্রিয় শিক্ষক তখন মারা গেলেও তা ছিল কালেভদ্রে। এ সময় বাড়িতেও মৃত্যুর আনাগোনা শুরু হয়, তবে সেটা মস্কো থেকে অনেক দূরে। ১৯৯৪ সালে দুবনা এলে প্রায় প্রতিদিনই দেখি কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। সবাই ছিল অপরিচিত। প্রথম পরিচিত লোক মারা যায় বেশ পরে। উনি প্রায়ই আমাদের অফিসে আসতেন। বলতেন " বেশি করে চা খাবে, তাহলে ক্ষিদে থাকবে না।" আসলে এটা ছিল নব্বইয়ের দশকের বিজ্ঞানীদের অবস্থা। তখন বেঁচে থাকাটাই ছিল আশ্চর্য ব্যাপার। মৃত্যু যেন মিছিল করে আসছিল বিজ্ঞানী আর শিক্ষকদের জীবনে। এখন অবশ্য (করোনা কাল বাদ দিলে) মানুষ সেভাবে মরে না। তাই কালেভদ্রে নোটিশ বোর্ডে সে রকম কোন খবর থাকলে তাঁর সম্পর্কে পড়ি আর অবাক হয়ে আবিষ্কার করি মৃত্যুর পরে তাঁর সম্পর্কে যতটা জানলাম, জীবিত থাকতে সেটা ধারনাও করিনি। যদিও এখন এ দেশে যুদ্ধ চলছে, তবে সেটা অনেক দূরে। যারা মারা যায় তাদের জন্য খারাপ লাগলেও অপরিচিত বিধায় মনের মধ্যে গেঁথে থাকে না।
ছোটবেলার কথা আমার মনে পড়ে সেই ১৯৬৮ সাল থেকে। বড় মাস্টারমহাশয় আমাদের প্রাইভেট পড়াতেন। একদিন দিদিকে ঘষি দিয়ে ঢিল মারলে সেটা পড়ে ওনার গায়ে। এমন বকেছিলেন যে বি ক্লাসে ভর্তি হয়ে যখন ওনাকে দেখি সামাদকে বেত দিয়ে মারছেন, সেই যে স্কুল ছাড়ি, পরবর্তী এক বছর আর ও মুখী হইনি। সে সময় মা অসুস্থ। আমার দিন কাটে বড়দা আর বৌদির ওখানে। রাতের বেলা বাড়ি ফিরি। বিকেলে কাকা বা মা গল্প শোনান। কাকা বলেন রামায়ণ আর মহাভারতের গল্প, মা লক্ষ্মীর পাঁচালি বা বসুমতির গল্প। কাকার গল্পে তাড়কা রাক্ষসী ছিল বহিরাগত। মার গল্পে দেব দেবীরা ঘরের মেয়ে হয়ে যেত। সে সময় বাড়িতে ছিলাম আমরা পাঁচ ভাই আর দিদি। সুবোধ দা আর স্বপন দা ইন্ডিয়া। মার গল্পে ওরা সব সময় থাকত, তাই দূরে থাকলেও চোখের আড়ালে থাকলেও মনের আড়ালে ছিল না। স্বপন দা ছিল হিরো। আমার বয়স যখন ছয় মাস বাড়িতে ডাকাত পড়ে, বাবা মা অজ্ঞান, ডাকাতরা আমাকে ন্যাকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে কেরোসিন ঢেলেছে আগুন লাগাবে বলে। তখন স্বপন দা ওদের কাছ থেকে আমার জীবন ভিক্ষা করে। আর সেই যে ভয় পায়, ক' দিন পরেই চলে যায় কোলকাতায়। এর পর ও আর দেশে ফেরেনি।
ও সময় বিশাল বিছানায় ঘুমুতাম তপন দা, কল্যাণ, রতন, দিদি, আমি আর মা। আর বাবা শুতেন আমাদের পায়ের কাছে। এর পর ধীরে ধীরে তপন দা কাছারি ঘরে চলে যায়। সেই যাওয়া পরে দীর্ঘ দিন ধরেই চলে। এক সময় কল্যাণ দা চলে যায় ইন্ডিয়া। ঘর খালি হতে থাকে।
যদিও সুধীর দা দেশেই ছিল ওর সাথে দেখা তেমন হত না। ও তখন ঢাকা কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে গণিতে। বাড়িতে তেমন আসে না। আসলে সে সময় ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার ঝক্কি অনেক। তিন তিনটে বাস বদলাতে হয়, তিন তিনটে নদী পার হতে হয়। তাই ও প্রায়ই যেত মির্জাপুর মামার ওখানে। পরে অবশ্য জেনেছি ও যতটা না মামাবাড়ি যেত তার চেয়ে বেশি করে যেত প্রেম করতে। ১৯৬৯ সালে কোলকাতা যাবার আগে মা তো ওর বিয়ে ঠিক করে গেলেন। ফিরে এসে শুনলাম ওর মত বদলিয়েছে। এখন তার নতুন ভালবাসার মানুষ। বাড়িতে অশান্তি, মা অনড়। ছেলে তার নিজের পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করবে। বাড়ি এল নতুন বউদি - শুক্লা বউদি। ডাকনাম আলতা। দুধে আলতার মত তার গায়ের রং। সময়ের সাথে সে আর বাড়ির বউ রইল না, হল বাড়ির মেয়ে। তখন থেকেই সুধীর দা বাড়ি থাকতে শুরু করল। কাছে থেকে ওকে দেখার সুযোগ পেলাম। আসলে আমাদের সবার জন্য মা ছিলেন দেওয়ালের মত। আমি বাবার ন্যাওটা। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা আর সমীহের শেষ নেই। মা সেদিক থেকে যতটা না মা তার চেয়ে বেশি খেলার সাথী। কিন্তু কোন রাতে যদি মন খারাপ হত, মনে মনে ভাবতাম বাবা রাগ করে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন, কল্পনায় মাই তখন এগিয়ে আসতেন। মা ছিলেন আশ্রয়ের স্থল। সবার জন্যেই। বাবা আমাদের বকতেন না খুব একটা, তবে বকলে মা হতেন উদ্ধ্বারকারিনী। আমার এখনও অবাক লাগে ভেবে এমন কেন ভাবতাম।
সুধীর দার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৫ নভেম্বর মানে আমার চেয়ে ও প্রায় ২০ বছরের বড়। মনে পড়ে ওর বিয়েতে বউদিদের পক্ষ থেকে একটা টি সেট দিয়েছিল। একান্নবর্তী বড় বাড়ির এই ছোট্ট অংশে যৌতুক নেবার রেওয়াজ ছিল না। রতন বাদে সবাই বিয়ে করেছে প্রেম করে, তাই যৌতুকের প্রশ্ন আসেনি কোনদিন। যাহোক, আমি ওই টি-সেট থেকে নিজের জন্য একটা কাপ বেছে নিয়েছিলাম। সুধীর দা তখন ছাত্র পড়ায় আর মাস্টারি করে বানিয়াজুরি হাই স্কুলে। সকালে রান্না ঘরে চুল্লী ঘিরে বসে চায়ের আসর। বিকেলের চা মূলত বারান্দায়, কখনও আমাদের এদিকটায়, কখনও বড়দার ওখানে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের জন্য সবাই বসে থাকি চুলার পাশে। একদিন তাড়াহুড়ো করে সুধীর দা আমার কাপে চা খেলে আমি অন্য একটা কাপ থেকে ওর মাথায় গরম চা ঢেলে দিই। খুব রেগে গেছিল, তবে কিছুই বলার সুযোগ পায়নি। বাবা, মা, কাকা, জ্যাঠার রায় - ওর ভুল ছিল আমার কাপে চা খেয়ে। তবে এ নিয়ে আমার প্রতি ওর ভালবাসা কমেনি। প্রতিদিনই চুয়িং গাম, চকলেট, বিস্কুট এসব আনত আমার জন্য। ও কিন্তু কখনই আমাদের সাথে খেলাধুলা করত না। বড়দা থেকে শুরু করে আমরা সবাই যখন এক সাথে ফুটবল, ভলিবল খেলতাম - সুধীর দা হয় বই পড়ত বা চা খেত অথবা ছাত্র পড়াত। রাস্তা ভাংলে বা জল এলে আমরা যখন সবাই মিলে রাস্তায় মাটি তুলতাম, খালের উপর সাঁকো তৈরি করতাম - সুধীর দা বই নিয়ে পড়ে থাকত। তবে রাজনৈতিক মন্তব্য করত বিশেষ করে বিবিসির খবর শোনার সময়। পরে আমরা যখন বাম রাজনীতি শুরু করি, তখনও ও ছিল নির্বিকার, রাজনীতি বিমুখ। তবে যেটা করত তা হল বই কিনে আমাদের পড়তে দিত। ওর হাত ধরেই আমার পরিচয় বিশ্ব সাহিত্যের সাথে। এরপর জন্মদিনে কৃত্তিবাসী রামায়ণ আর কাশিদাসী মহাভারত দেয়। এরপর প্রায়ই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, দস্তয়েভস্কি, তুরগিনেভ এসব দিতে শুরু করে। তবে এ ব্যাপারে শুধু সুধীর দাই নয়, বাড়ির অন্যেরাও উৎসাহ দিত। আর ছিলেন পণ্ডিত স্যার। সুধীর দা বা পণ্ডিত স্যার কোন বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন
এই বইটা পড়িস।
যতদূর জানি, আমাদের স্কুলের অনেককেই পাঠ্য পুস্তকের বাইরের বই পড়তে আগ্রহী করে তোলেন এই দুজন। আমাকে সব সময় বিশ্ব সাহিত্যের নাম করা লেখকদের বই পড়তে দিলেও সুধীর দা ডিটেকটিভ পড়তে পছন্দ করত। মাসুদ রানা, বেনহুর, নীহার রঞ্জন - এসব বই বগলদাবা করে হাঁটত। আর ঘর থেকে বেরুনোর সময় কিছু চাল আর একটু লবন মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বেরিয়ে যেত। সুধীর দা আর বউদি যে ঘরে থাকত তার নাম ছিল বড় ঘর। ওখানেই কুলের ঠাকুর দেবতা ঘুমুত, খেত। ওই ঘরেই থাকত বস্তা ভরা লবন, চিনি, কোলা ভরা গুড় আর ড্রাম ভরা চাল, ডাল ইত্যাদি। ওর এই চাল আর লবন খেতে দেখে আমরা মুচকি মুচকি হাসতাম। আমি সে অর্থে ডিটেকটিভ একদমই পড়িনি। একটাই বই পড়েছি, হত্যা হাহাকারে। তবে দস্তয়েভস্কি, কাম্যু, কাফকা, সারত্রে পড়ে আমি যেন ডিটেকটিভ পড়ার আনন্দ পেয়েছি। স্কুলে থাকতেই কোলকাতা থেকে অংক আর পদার্থবিদ্যার বই এনে পড়তে দিত।
এই অংকগুলো করিস তো। পরে যখন ছাত্র পড়াতে শুরু করে আমাকে বলত অন্যদের সাহায্য করতে।
দেখ তো অংকটা মিলছে না। তোর হয় কি না?
ধীরে ধীরে আমরা হই কলিগ। একবার মনে আছে স্কুলে সুধীর দা আর ক্ষিতিশ স্যারের মধ্যে বিতর্ক শুরু হল দ্বিঘাত সমীকরণ নিয়ে। আমি ক্লাস টেনে পড়ি। দুজনে এসে আমার মতামত জানতে চাইলেন। ভারি মুস্কিল। সুধীর দা আমাদের প্রতিটি অংক বিশ্লেষণ করে শেখায়, ক্ষিতিশ স্যার ফর্মুলা অনুযায়ী। কেউ ভুল করছে না। তাই বললাম
আসলে আমরা যদি জানার জন্য পড়ি তাহলে বিশ্লেষণ করে পড়াই ভালো আর যদি নম্বরের জন্য পড়ি ফর্মুলাই যথেষ্ট। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের প্রাইওরিটি কি?
কেউই অখুশী হন নি।
ক্লাস টেনে আমাদের প্রথম ক্লাস নিতেন পণ্ডিত স্যার। আমি প্রতিদিনই লেট করতাম। তবে জানালা দিয়ে দূরে আমাকে আসতে দেখে উনি আমাকে প্রেজেন্ট করে রাখতেন। আমার মনে হয় তখন আমি ছিলাম লেনিনের বিখ্যাত "এক পা আগে দুই পা পিছে" বইয়ের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত উদাহরণ। তবে এটা ঠিক গবেষণার কাজ তাড়াহুড়ো করে করতে নেই, এমন কি কাজ শেষ করেও বারবার প্রশ্ন করতে হয়। হয়তো এভাবেই আমার মধ্যে গবেষণা করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। সুধীর দার ক্লাস ছিল পরে। কোন কোন দিন প্রথম ক্লাস থাকলে নাম ডাকত। ও জানতো আমি ওকে ইয়েস স্যার বলব না। আর সবাই সেই অপেক্ষায়ই থাকত আমি কী বলব, ইয়েস স্যার না ইয়েস দাদা। আমি ছিলাম ফার্স্ট বয়। ও আমাকে বাদ দিয়ে বিচিত্রকে দিয়ে শুরু করত। আমাদের সময়ে ভালো ছাত্ররা ক্লাস এইট থেকে মানিকগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে পড়তে যেত। আমি অবশ্য তেমন ভাবিনি। সুধীর দা নিজেই বলল
নিজের পড়াটাই আসল। তুই তো এখানেই পড়াশুনা করছিস। মানিকগঞ্জ গিয়ে কী হবে?
আবার যখন স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা উঠল, ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে গিয়েও ফিরে এলাম। তখন স্টার মার্ক থাকলে ভর্তিতে সমস্যা হত না, তবে হোস্টেলে সীট পাওয়া সমস্যা। রামকৃষ্ণ মিশনে অনেকেই থাকত। ততদিনে অবশ্য ঈশ্বর আর আমার পথ দুটো দিকে গেছে বেঁকে। ভর্তি হওয়া হল না। সুধীর দাও চায়নি আমি বাড়ি ছেঁড়ে কোথাও যাই। আসলে অংকের প্রতি আমার বরাবরই দুর্বলতা ছিল। সুধীর দা আর তপন দা গণিতে মাস্টার্স করে তাই আমার পদার্থবিদ্যা বেছে নেওয়া। মস্কো আসি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। এয়ারপোর্টে নেমেই বলি সাবজেক্ট বদলে পদার্থবিদ্যায় যাব। ছাত্র সংগঠনের প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হয়েছিল। পরে শিক্ষকদের কেউ কেউ রসায়নে, কেউ কেউ গণিতে পড়তে বলেছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আমি পদার্থবিদ্যার প্রেমে পাগল। আমি মস্কো আসি রাজনৈতিক কারণে। তখন ছাত্র ইউনিয়ন আর খেলাঘর নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে বাবা প্রমাদ গুনলেন। এর আগে স্বপন দা নক্সাল করে বাড়ির সবাইকে অনেক দুশ্চিন্তায় রেখেছে। তাই বাবা বললেন
দেশ ছাড়তে হবে। যদি চাও আমেরিকা যেতে পার অথবা রাশিয়া, যেহেতু সেই রাজনীতিই করছ। কিন্তু দেশে থাকা হবে না।
সুধীর দা আমার আমেরিকা যাওয়ার পক্ষে ছিল। আমরা যারা বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম তারা রাশিয়ার পক্ষে। তাছাড়া রাশিয়ার প্রতি আমার ভালবাসা যতটা না সমাজতন্ত্রের জন্য তার চেয়ে বেশি করে দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ - এদের লেখা থেকে। এমন কি রাশিয়ায় আসার পরেও কালেভদ্রে সুধীর দা চিঠি লিখলে আমি যেন আমেরিকা চলে যাই সেটাই বারবার বলত আর আমিও অমল দা, গণেশ দাদের উদাহরণ দিয়ে ওর সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করতাম।
সুধীর দার সাথে আমি নিজের মিল খুঁজে পাই মনিকার জন্মের পরে। এ দেশে অনেকের বিয়ের আগেই বাচ্চা হয়, বাচ্চা হবার পরেও অনেকেই অফিসিয়ালি বিয়েও করে না আবার বিয়ের পরেও অনেকেই বাচ্চা নেয় না। আমাদের দেশে বিয়ে মানেই বাচ্চা। বিয়ের অনেকদিন পরেও যদি বাচ্চা না হয়, শুরু হয় কানাঘুষা। আর সেটা যত না করে বাড়ির লোক তার চেয়ে বেশি পাড়া প্রতিবেশি। অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে কেন যে এত আগ্রহী আমাদের দেশের মানুষ?
অনেক দিন পর্যন্ত আমিই ছিলাম বাড়ির ছোট সন্তান। এর মধ্যে অবশ্য সুবোধ দা আর ভাগবত দার সন্তান হয়েছিল, তবে ওরা থাকত ইন্ডিয়া, তাই সুধীর দার বিয়ের পরে সবাই নতুন মুখের আশায় বসে ছিল। তবে সেটা খুব তাড়াতাড়ি হয়নি। ভ্রমরের জন্ম ১৯৭৫ সালে। আমার বয়স তখন ১১। সুধীর দা মনে হয় পুত্র সন্তান হবে বলে আশা করেছিল, তাই প্রথম প্রথম প্রায়ই খিটিমিটি করত। কিন্তু তারপর ভ্রমরকে এমন ভাবে ভালবেসে ফেলে যে যাকে বলে ভ্রমর অন্ত প্রাণ। সেই ছোটবেলা থেকেই ও ভ্রমরকে বোঝাতে চেষ্টা করত আর ভ্রমর না বুঝলে রেগে যেত। একদিন হঠাৎ শুনি ভ্রমরের কান্না। সুধীর দা কী যেন বলছে আর ভ্রমর শুনছে না। বউদি স্কুলে। সুধীর দা বলছে, "এবার তোকে খুন করে ফেলব।" আমি দৌড়ে গিয়ে সুধীর দাকে ধাক্কা দিয়ে ভ্রমরকে নিয়ে আসি। না আমি না সুধীর দা - কেউই এমন আচরণ আশা করি নি। অনেক পরে মনিকা দুবনা আসে মাত্র দুই বছর বয়সে। গুলিয়াকে মাঝে মধ্যে আন্তনকে নিয়ে মস্কো যেতে হত নাচের ক্লাসে। আমি মনিকাকে বুঝিয়ে কিন্ডার গারটেনে পাঠানোর চেষ্টা করতাম আর ও কিছুতেই যেতে চাইত না। আমার অফিস যাওয়া হত না। মাঝে মধ্যে প্রচণ্ড রেগে যেতাম, শাস্তিও দিতাম। সুধীর দা ভ্রমরকে কোলে নিয়ে প্রায়ই গান করত, গান মানে অসংলগ্ন শব্দাবলী। আমিও অবাক হয়ে দেখতাম, মনিকা, ক্রিস্টিনা বা সেভাকে কোলে নিয়ে আমি সুর করে গাইতাম, গুলিয়া যাকে বলত, "স্তো ভিঝু তো ই পাইয়ু" মানে যা দেখি তাই গাই। তখন নিজের ভেতর সুধীর দার ছবি খুঁজে পেতাম। এটা ছিল অবাক করা কাণ্ড। সুধীর দা চাকরি শুরু করে ১৯৭০ সালে। কিন্তু বাড়ির অবস্থা ভালো থাকায় কোন টাকা পয়সা বাড়িতে দিতে হত না। ওর টাকা করচ হয়ে যেত বই আর চায়ের দোকানে। এমন কি যখন অনেক ছাত্র পড়াতে শুরু করে আর উপার্জন বাড়ে তখনও এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। যারা প্রাইভেট পড়ে টাকা দিত দিত, না দিলেও কোন কথা ছিল না। ছাত্ররা গরীব হলে টাকা তো নিতই না উল্টো ওদের বই কিনে দিত। পড়ানোর আনন্দেই ও পড়াত। তাই বাবা মা কখনই ঠিক ওর উপর ভরসা রাখেননি। বাবা মার ভরসা ছিল পরবর্তী সন্তানদের উপর, যারা রাজনীতি করত, সামাজিক কাজকর্মে এগিয়ে যেত। এক কথায় আর দশ জনের মত ছিল। সুধীর পাগলার মত ছিল না। আশ্চর্যের ব্যাপার পাগল উপাধিটা সুধীর দার সাথে সাথে আমার ভাগ্যেও জুটেছিল বাড়িতে থাকতেই। তবে সেখানে আমি সুধীর দার সাথে মিল খুঁজে পেতাম না, ছিল আমার এক্সেন্ট্রিক ব্যবহার। তবে কেউই বাবা মার আশা পূরণ করতে পারেনি আর পরবর্তী পর্যায়ে সুধীর দা, বউদি আর দিদি সংসারের হাল ধরে।
১৯৮৯ সালে মাস্টার্স কমপ্লিট করে যখন দেশে ফিরি সুধীর দা অনেক বলে কয়ে আমাকে আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে পাঠাল বার দুয়েক। সে সময় কমরেডরা আর কমরেড নেই, আমি নিজেই রেনেগেড হয়ে গেছি, তাই মস্কোর হাতছানি ছিল আবার তেমন পিছুটানও ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত মস্কো ফিরে যাই পিএইচডি করার জন্য। ওই সময় আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। বাড়িতে টেলিফোন ছিল না, আজকের মত ইন্টারনেট ছিল না। তাই অন্যেদের সাথে যোগাযোগ থাকলেও ওর কাছ থেকে আলাদা করে চিঠি পেতাম না। ১৯৯১ সালে যখন দেশে যাই বাবা মারা গেছেন। সময় কেটেছে চুপচাপ বসে থেকে। ১৯৯৭ সালে আবার যাই মূলত পুনায় একটা কংগ্রেসে যোগ দিতে। তখন আমি অলরেডি দুবনায় চাকরি করি। এবার মাও মারা গেছেন। এক কথায় দেশের সাথে নাড়ির সম্পর্ক হালকা থেকে হালকাতর হয়ে আসছে। নিজেও ব্যস্ত কাজ আর সংসার নিয়ে। আসলে এখানে যখন বিয়ে করে থেকে যাই, তখন সুধীর দা বুঝতে পারে আমি আর আমেরিকা যাচ্ছি না, তাই আমাকে নিয়ে ওর আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে। এরপর নতুন শতাব্দীতে ইন্টারনেটের কল্যাণে নতুন করে যোগাযোগ হয় বাড়ির সাথে। গ্রামীন ফোন আসে। আমরাও অল্প পয়সায় ফোন করার উপায় খুঁজে পাই। ইতিমধ্যে ভ্রমর ইউনিভার্সিটি শেষ করে বিয়ে বসেছে, কিছু দিন দেশে কাজ করে ওরা চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া ২০০৫ এর শুরুতে। সব মিলিয়ে সুধীর দা ভেঙ্গে পড়েছে মানসিক ভাবে। পরে শুনেছি দেশে কী সব ঝামেলায় ও মহিলা কলেজের চাকরি ছেঁড়ে দেয়, অনেক দিন বহরমপুর মামার ওখানে থাকে। সেখানে ওর ছাত্ররা আজও নাকি সেই স্যারের কথা স্মরণ করে। এরপর দেশে ফিরে চাকরি না খুঁজে প্রাইভেট পড়াতে শুরু করে মানিকগঞ্জ একটা রুম ভাড়া করে। আমি দেশে থাকতেই দেখেছি ও শুধু স্কুল কলেজের ছাত্রদেরই নয়, ইউনিভার্সিটির অনার্স বা মাস্টার্স কোর্সের ছাত্রদেরও পড়াত। কঠিন জিনিস সহজ করে বোঝানোর এক অদ্ভুত শক্তি ছিল ওর। সেই ছোটবেলা থেকেই একটা কথা চালু ছিল বাড়িতে - সুধীর অতিরক্ত চা খেয়ে লিভার নষ্ট করে ফেলেছে। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট ভোগ করেছে লিভার নিয়ে। প্রায়ই হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০০৭ এর পর থেকেই যাকে বলে যমে মানুষে টানাটানি। এর মধ্যে কোন রকম পূর্বাভাস না দিয়ে ২০০৯ সালে বৌদির মৃত্যু। এরপর ফোন করলেই বলত, "বিজন আমি আর বাঁচতে চাই না। আর বাঁচব নারে।" মানুষ যখন জীবনকে ভালবাসতে ভুলে যায় তখন তাকে জীবনে ফিরিয়ে আনা কষ্ট। ২০০৯ সাল ডিএসসি ডিফেন্ড করার পর মস্কোর বাংলাদেশী সমাজে আমার কদর কেমন করে যেন বেড়ে যায়। যদিও আমি নিজে কোন রকম পরিবর্তন খুঁজে পাইনি, তবে বন্ধুরা কী যেন দেখতে পেয়েছিল। শুরু হল যোগাযোগ, ফোন নম্বর বিনিময়। কেউ কেউ সংগঠন করা যায় কিনা সেটা বলে। গুলিয়া তখন বাচ্চাদের নিয়ে মস্কো চলে এসেছে, তাই সংগঠন মানে মস্কো আসার অজুহাত। আমিও যেন হাতে চাঁদ পেলাম। ২০১০ সালে পালন করলাম বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। সাড়া পেলাম অভাবনীয়। শুরু হল বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ, রাশিয়া গঠনের কাজ। তখন মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত আর মিনিস্টার দুজনেই আমাদের ভিপুস্কনিক, মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাশ করা। আমাকে বলা হল আমাদের সংগঠন করার কথা তাঁদের জানাতে। তোমরা যে সংগঠন করতে চাইছ এরা (মস্কোর বাঙ্গালী সমাজের কিছু হোমরাচোমরাদের নাম বললেন) এটা করতে দেবে।
আমরা জনা দশেক মানুষ এক হয়েছি সংগঠন করব বলে। আমাদের ঘোষণা পত্র থাকবে বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য রেখে। যদি কেউ আমাদের সাথে আসতে চায়, ওয়েলকাম। আমরা কারও বিরুদ্ধে কিছু করছি না। শুধু নিজেদের স্বপ্নের কথা বলার জন্য একটা সামাজিক ফোরাম তৈরি করছি।
এরপর শুরু হল রাজনীতি। দূতাবাস থেকে চাইলো আমরা যেন ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করি। রাষ্ট্রদূত ফোন করলে বললাম, "আজ আপনারা ক্ষমতায় তাই বঙ্গবন্ধুর নাম লিখতে বলছেন। দুদিন পরে অন্যেরা ক্ষময়ায় এসে যদি এ নাম সরাতে বলে বা অন্য নাম বসাতে বলে তখন আমরা কী করব?" বোঝা গেল কথাটা তাঁদের মনপুত হয়নি। আমরাও সংগঠনের ঘোষণাপত্র আর গঠনতন্ত্র নিয়ে স্থবিরাবস্থায় পড়ে গেলাম। অনেকের মতে অন্য সংগঠনের কেউ আমাদের সংগঠনের কমিটিতে নির্বাচিত হতে পারবে ন। আমার যুক্তি "দেখ, আমাদের সংগঠনের যেকোনো সদস্যের সমান অধিকার থাকা উচিৎ, মানে যে কেউ যেকোনো পদে নির্বাচিত হতে পারে। কিন্তু একবার যদি কেউ নির্বাচিত হয় তখন বলতে পার, এখন তোমার দায়িত্ব অনেক বেশি, তাই তুমি অন্য সংগঠনের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হতে পারবে না।" কিন্তু এই সহজ কথাটা বোঝানও সহজ হল না। মানুষ আসলে দল করার আগেই দলীয় আঁতর গায়ে মাখে। বড় বড় আদর্শের বুলি - এটা তোতা পাখির বুলি বই কিছু নয়। যাহোক ২০১০ সালের ৪ জুলাই প্রবাসী পরিষদ আত্মপ্রকাশ করল আর ওই বছর ২৪ ডিসেম্বর আমরা একটা কম্প্রমাইজে এসে সংগঠনের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র গ্রহণ করলাম। পরের দিন আমার আর শাহীনের জন্মদিন। তাই দুজনে চলে গেলাম ওর বাসায়।
সে সময় আমাদের মত সাধারণ চাকুরিজীবীদের পকেটে স্মার্টফোন আসেনি। ই-মেইল চেক করতে হয় ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে। শাহীন আমাকে ওর ল্যাপটপ দিয়ে গেল রান্না করতে। দেখি তপন দার মেইল। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। বেশ বড় চিঠি। এক জায়গায় লিখেছে সুধীর দা তো বছর পাঁচেক আগেই মারা গেছে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। আবার যে চিঠিটা পড়ব সে শক্তি পর্যন্ত রইল না। পরের দিন ঘুম ভাংতেই দিদিকে ফোন করলাম।
আচ্ছা সুধীর দা পাঁচ বছর আগে মারা গেছে সেটা বলিস নি কেন?
তোকে এ কথা কে বলল। তুই না সেদিনও ওর সাথে কথা বললি।
তোরা কাউকে দিয়ে সুধীর দার গলায় কথা বলিয়েছিস।
ছোটবেলায় আমার প্রায়ই মনে হত মা বোয়াল মাছ বা অন্য মাছ কেটে রুই বা কই মাছ বানিয়ে আমাকে খেতে দেন। এখনও সেটাই মনে হল।
ভাই, তুই আমার কথা বিশ্বাস করছিস না কেন? কথা বলবি। দাদা তো বাড়িতেই।
না।
অনেকক্ষণ থ হয়ে বসে রইলাম। তারপর এক সময় চিঠিটা আবার পড়লাম। ওখানে লেখা ছিল সুনীল দার মৃত্যুর কথা। কমরেড সুনীল রায়। উনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। মনে হয় কোন একসময় আমি নিজেই সুনীল দার কথা জানতে চাইছিলাম। তপন দা সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছে। আর আমি ভুল করে সুনীল দার পরিবর্তে সুধীর দা পড়ে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়েছি। সে রাতে মস্কোয় বরফ বৃষ্টি হয়েছে। শাহীনের গাড়ির কাঁচ আইস মানে বরফে ঢাকা। অনেক কষ্ট করে কাঁচ পরিস্কার করা গেল। শাহীন আমাকে আকাদেমিচেস্কায়ায় বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমি একটা কেক কিনে গেলাম বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে।
যতদূর শুনেছি পরের দিকে সুধীর দা রাজনীতি করত, রাজনীতি মানে আওয়ামী লীগ। করত সক্রিয় ভাবেই। শুনেছি একবার যখন শেখ হাসিনা তরা হয়ে ঢাকায় যান সুধীর দা তাঁকে নেমে জনগণের সাথে কথা বলতে অনুরোধ করে। উনি রাজি হননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সুধীর দা নাকি মুখের উপর বলে দেন, যদি সাধারণ মানুষের সাথে নেমে কথা না বলতে পারেন আপনি আবার কিসের নেত্রী। সত্য মিথ্যা বলতে পারব না, তবে আমাদের বাড়ির কেউই এরকম ভাবে কারো মুখের উপর নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করে না। সুধীর দা সব সময়ই ছাত্রদের প্রিয় ছিল। ও নিজে যেমন ছাত্রদের ভালবাসত, ছাত্ররাও একই ভাবে ওকে ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত। ২০০২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ হয়। একদিন বিএনপি, জামাতের এরকম একটা দল মিছিল করে আসছিল তরা গ্রামের হিন্দুদের উপর আক্রমণ করার জন্য। ওই মিছিল থেকে এক ছাত্র দৌড়ে আসে আমাদের বাড়ি তার সুধীর স্যারকে সতর্ক করে দিতে। আর সাথে সাথে মজনু ভাইরা এসে বাড়ির সবাইকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এটা কী সাফল্য না ব্যর্থতা? একদিকে ছাত্রের ভালবাসা সুধীর দাকে আক্রমনের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। অন্য দিকে যে মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছে, তাদের ভালোবেসেছে, সেই ছাত্রদের একজন যদি ধর্মীয় উন্মাদনার শিকার হয়ে অন্য ধর্মের মানুষদের আক্রমণ করে সেটাও তো ওই শিক্ষকেরই ব্যর্থতা। শিক্ষক তো শুধু অংক বা কোন বিশেষ বিষয় শেখান না, ছাত্রদের সবার আগে মানুষ হতে শেখান।
সত্তরের দশকে আর আশির দশকের শুরুর দিকে পড়াশুনা ছাড়া আমার জীবনে সুধীর দার উপস্থিতি তেমন অনুভব করেছি বলে মনে হয় না। আসলে ও আমাদের বিভিন্ন রকম বই পড়তে দিত ঠিকই কিন্তু আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে কখনও অংশগ্রহণ করত না। আমাদের বাড়িতে পাকিস্তান আমল থেকেই আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ছিল, তবে কেউ সক্রিয় রাজনীতি করত না। তপন দা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত থাকলে থাকতেও পারত, তবে বাড়িতে এ নিয়ে কখনই কথাবার্তা বলত না। হয়তো সবাই তখন স্বপন দাকে নিয়ে চিন্তিত ছিল বলে। বড়দা বছরের ৯ মাস বাড়ির বাইরে থাকত। আগে নিজে যাত্রা দলে অভিনয় করত আর ১৯৬৯ সাল থেকে নিজেই অম্বিকা নাট্য প্রতিষ্ঠান নামে এক যাত্রার দল তৈরি করে। বড়দার উদ্যোগে আমি ১ কাঁচা টাকা দিয়ে মালিকদের একজন হতাম সেই দলের। বড়দা যখন বাইরে থাকত আমি থাকতাম তপন দার তত্ত্বাবধানে। ওর সাথেই খেতাম এক থালায়। ১৯৮০-১৯৮২ সালে আমি যখন কলেজে পড়ি একদিন কে যেন খবর দিল তপন দা অপেক্ষা করছে যতীন ঘোষের মিষ্টির দোকানে। গেলে ও আমাকে আজাহার ভাইএর সাথে আলাপ করিয়ে দিয়ে চলে গেল। এটা করেছে মনে হয় আমার উপর কোন রকম চাপ সৃষ্টি না করার জন্য। ক’ দিন পরে কলেজে নির্বাচন। আজাহার ভাই বললেন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে এজিএস পদে ইলেকশন করতে। ওই সময় দেবেশ নামে আমাদের এক এক ক্লাসমেট যে ছাত্র লীগ থেকে এজিএস পদে ইলেকশন করেছিল, বলেই বসলো, "বিজন দা যেদিন রাজনীতি করবে সেদিন সূর্য পশ্চিম দিকে উঠবে।" আমি রাজনীতি সচেতন ছিলাম, রেগুলার এ নিয়ে পড়াশুনা করতাম, সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহী ছিলাম কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করার ইচ্ছে কখনই ছিল না। আমার মনে হয়েছে ভালো বিশেষজ্ঞ হয়েই দেশের সেবা করা যায়। আজাহার ভাইকে আমি বললাম ভেবে দেখব। তারা যেন আমাকে ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে লিটেরেচার দেন পড়তে। পরে তুলু ভাই, লতিফ ভাই, দুলাল দা, পরেশ দা সহ অনেকেই আমাদের বাড়ি এলেন। অনেক কথা হল। কিন্ত আমার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেলাম না। ঠিক হল আমি ছাত্র ইউনিয়নের মেম্বারশীপ নেব না, তবে ইলেকশন করব। যদি এক সাথে কাজ করতে গিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর পাই, যোগ দেব। এরপর ইলেকশন করলাম। তবে সেই ইলেকশনের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। ওরা নিজেরাই আমার নির্বাচনী পোস্টার ছাপাল। তাতে লিখল যে আমি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি আর এসএসসি তে স্টার পেয়েছি। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাবার ব্যাপারটা ছিল মিথ্যে। আরও একটা ব্যাপার হল নির্বাচনের আগে আগে। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্কলারশীপ দেবার ব্যাপারে কলেজে ঘোষণা করা হল। ব্যাপারটা দাঁড়ালো আমি যেন স্কলারশীপের জন্য নির্বাচন করছি। আমার বিশ্বাস আমি নিজের রেজাল্ট দিয়েই সেটা করতে পারতাম। এ ধরণের কাজকর্ম আমাকে ব্যথিত করেছিল। আমার কলেজ জীবন নিয়ে পরে কখনও লিখব। ধীরে ধীরে জড়িত হলাম খেলাঘরের সাথে। গ্রামে খেলাঘর আসর করলাম। রতন শুরু করল খেলাঘর আর উদীচী করা। এক কথায় আমাদের ঘরে বাম রাজনীতি ঢুকল। ঢাকা থেকে সুনীল দা, লেনিন ভাই, মানিকগঞ্জের আজাহার ভাই, হজরত ভাই, প্রমথ দা সহ বাম ঘরানার রাজনীতিবিদদের জন্যে বাড়ির দ্বার খুলে গেল। সুধীর দা ছিল তখন ডঃ কামাল হোসেনের অনুসারী। ফলে তপন দা বা রতন যেখানে শুধু ভাই নয় কমরেড হল, সুধীর দা শুধু দাদাই রয়ে গেল। এরপর মস্কো এলাম। এর আগে আমি অবশ্য বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলাম। এরশাদের দমন নীতির ফলে ক্লাস শুরু হয়েছিল অনেক পরে। একদিন ফিজিক্স ক্লাসে টিচারকে একটা প্রশ্ন করায় বললেন, "ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য এসব না জানলেও চলবে।" তখনই ঠিক করেছিলাম যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়া নাও হয়, পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হব। মস্কো আসার পরে যখন সাবজেক্ট চেঞ্জ করি বাবা নিজে কিছু না বললেও সঞ্জীব স্যারসহ অনেককে দিয়েই বলানোর চেষ্টা করেছেন বিষয় না বদলাতে। তবে সুধীর দা আমার পদার্থবিদ্যা পড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
সত্তর আর আশির দশকে বিদেশ যাওয়া আজকালের মত ডাল ভাত ছিল না। তখনও মধ্যপ্রাচ্যে এত লোক যেতে শুরু করেনি। আমাদের এলাকা থেকে হাতে গনা কিছু লোক বিদেশে পড়াশুনা করত। তবে এরপরে আমাদের স্কুলের অনেকেই বাইরে যায় বৃত্তি নিয়ে। বর্তমানে প্রায় সব বাবা-মাই চান ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়াশুনা করুক, সেখানেই সংসার পেতে বসুক। এই সূত্র ধরে অনেকেই বাইরে থেকে যায়, পেছনে রেখে যায় বৃদ্ধ বাবা মাকে। যে বাবা মার ইচ্ছা পূরণের জন্য সন্তান দেশছাড়া হয় তাকেই আবার অকৃতজ্ঞ বলে অভিযুক্ত হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ভ্রমর বিয়ে বসে, ওরা দুজন দেশেই অনেকদিন চাকরি করে আর এক সময় অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। সুধীর দা মনে হয় এটা ঠিক মেনে নিতে পারেনি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেড়াতে যায়নি। তখন থেকেই শুরু হয় এক ধরণের ডিপ্রেশন।
ইতিমধ্যে আমাদের আগের জেনারেশনের সবাই বিদায় নিয়েছেন। আমাদের জেনারেশনের বড়দি আর ভাগুদাও চলে গেছে। কিছুদিন আগে রঞ্জিত দা মারা গেল। রঞ্জিত দাও ছিল সুধীর দার মতই - সব হৈ হুল্লর থেকে দূরে। ও ও ফুটবল বা ভলিবল খেলত না। নাম ছিল ম্যারা বাবু। এমন কি বিয়ের পরেও বসে থাকত কখন মেজমা মুখে ভাত তুলে দেবে। বিএ পাস করে একটা স্কুলে পড়াত। তিন কন্যার জনক। তারপর অসুখ, অনেক দিন বাড়ি আর হাসপাতাল। আমাদের বাড়ি বরাবরই অনেক কুকুর ছিল, তবে যতদিন কুকুর ছোট ছিল আমরা সবাই ওদের আদর করতাম, এরপর ওরা হয়ে যেত বেওয়ারিশ। বাড়িতে খেত, ঘুমুত, রাতে কেউ গেলে ঘেউ ঘেউ করত, তবে যাকে বলা হয় অস্পৃশ্য ছিল। একমাত্র রঞ্জিত দাই ওদের সাথে একটু খেলাধুলা করত, গায়ে হাত বুলিয়ে দিত। সেই রঞ্জিত দা অসুস্থ। একদিন বাড়ি থেকে ফোন এলো।
রঞ্জিত দাকে বাড়ি নিয়ে এলাম, ডাক্তাররা আশা ছেঁড়ে দিয়েছে। কে জানে আর কতক্ষণ বাঁচবে। কথা বল।
কিরে রঞ্জিত দা, কি খবর? শরীর এখন কেমন?
তোর সাথে আর দেখা হল না। আর হয়তো বাঁচব না। মেয়েরা রইল, সবাই ওদের দেখে রাখিস।
২০০৮ সালে রঞ্জিত দা চলে গেল। বড়দি আর ভাগুদা মারা গেছে কোলকাতায়। রঞ্জিত দা ছিল বাড়ির ছেলে। ও, তপন দা আর বউদি পাশাপাশি বয়সের। আমাদের ছোটবেলা কেটেছে একসাথে গান বাজনা করে। দিদি, রতন আর এক সময় আমি গান শিখতাম, রঞ্জিত দা, কল্যাণ দা আর আমি তবলা শিখতাম। একসাথে সকাল বিকাল চা খাওয়া, গল্প করা। রঞ্জিত দা রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতে পারত। আজ ও চলে গেল। সবাই নতুন করে বুঝতে পারল এবার আমাদের জেনারেশনের চলে যাবার সময় এসেছে। কতই বা বয়স ছিল ওর তখন? ৫৫? বউদি অস্ট্রেলিয়া যায় ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ইশানের জন্মের পর পর। সুধীরদারও যাবার কথা ছিল। গেল না। বৌদির সাথে প্রায়ই ফোনে অনেক কথা হত। ওই সময় সুধীর দা গেলে অনেক কথাই বলা যেত। আমি ডিএসসি ডিফেন্ড করলাম ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর। দাদা বউদি সহ বাড়ির সবাই খুশি। অনেক বার বলেছে দেশে ঘুরে যেতে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে হয়ে ওঠেনি। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর বউদি চলে গেলে অপ্রত্যাশিত ভাবে। মনে নেই সেই সময় কেউ ফোন করেছিল নাকি পরবর্তীতে দিদি হাজার বার বলেছিল সেদিনের ঘটনা, মনে হয় সব যেন চাক্ষুষ দেখা। প্রতিদিন সকালে দিদি আর বউদি একসাথে বেরিয়ে যায় চাকরিতে। বউদি জাবরা গার্লস স্কুলে আর দিদি উথুলী গার্লস স্কুলে। দিদি ক্লাস নিচ্ছিল। হঠাৎ ফোন এলো জাবরা থেকে দিদি, বৌদির রক্ত বমি হচ্ছে। তাকে নিয়ে আমরা মানিকগঞ্জ হাসপাতালে যাচ্ছি। আপনি চলে আসেন।
সুধীর দা বাড়িতে অসুস্থ। রতন ঢাকা গেছে বিটিভির অডিশনে। এর মধ্যে অনেকেই খবর পেয়ে চলে এসেছে মানিকগঞ্জ। যেহেতু রক্ত বমি হয়েছে তাই মূল সন্দেহ পাকস্থলীর উপর। এক পর্যায়ে তারা রোগীকে ঢাকা নিয়ে যেতে বলে। পপুলারে (?) নিয়ে যাওয়া হয়। দুদিন যমে মানুষে টানাটানি। বানের জলের মত টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউই স্ট্রোক যে করতে পারে সেটা ভাবছে না। সঠিক ডায়াগনোসিসের অভাবে কত রোগী যে অকালে প্রাণ হারায়। এ ঘটনা যেন বাড়ির ভিত্তি নাড়িয়ে দিল। সবাই চিন্তিত ছিল সুধীর দাকে নিয়ে আর সেখানে এভাবে বউদি চলে গেল। কীভাবে দাদাকে জানানো হবে বৌদির মৃত্যু সংবাদ? বিশেষ করে ওর শরীরের যে অবস্থা। দিদি ফোন করে যতটুকু না কথা বলে তার চেয়ে বেশি কাঁদে।
দিদি, দেখত গত ২০ বছরে বাড়ির মৃত্যুগুলোর কথা স্মরণ করে। জ্যাঠামশাই, বাবা, কাকা, মা, খুড়ি মা, বড়মা, জেঠিমা, মেঝমা, বড়দি, ভাগুদা, রঞ্জিত দা সবাই অসুখে কীরকম কষ্ট করে মারা গেছে? বউদি তো বলতে গেলে কোন কষ্টই করেনি। এখন কী করবি। যদি এ অবস্থায় ঘরে পড়ে থাকত ব্যাপারটা কি ভালো হত।
জানি এভাবে বলতে নেই, তবে মাঝে মধ্যে কঠিন হলেও অনেক সত্য কথা বলতে হয়। সুধীর দা বৌদির মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। আমি ফোন করি
বিজন, এ কী হল? আমি আর বাঁচব না। বাঁচতে চাই না।
মরে যাওয়া তো অপশন হল না। ভ্রমর আছে। ওর ছেলে আছে। বউদি তোমাকে বাঁচানোর জন্য কি না করল। আর তুমি এখন বলছে বাঁচতে চাও না, এটা কোন কথা হল?
তুই কবে আসবি?
এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। সময়, সুযোগ, সামর্থ্য - কোনটাই নেই।
চাইলেই তো আসা যায় না। দেখি চেষ্টা করব।
পরবর্তী একটা বছর সুধীর দা হাসপাতাল আর বাড়ি করে কাটাল। এই ভালো তো এই খারাপ। মনে হয় ওই সময় যদি আবার ছাত্রদের কাছে ফিরে যেতে পারত তাহলে মনসিক কষ্টটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারত। মানিকগঞ্জে একটা ঘরও রাখা ছিল। কিন্তু শারীরিক বা মানসিক কোন ভাবেই ও এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। এ যেন বসে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। আশ্চর্যের ব্যাপার হল বাবা মাকেও দেখেছি পরস্পরের উপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল। একই ঘটনা ভাইদের ক্ষেত্রে। যদিও বাবা, সুবোধ দা, সুধীর দা এমনকি মনে হয় স্বপন দা নিজেও রান্না বান্না সহ বিভিন্ন কাজে বউদের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তপন দা থেকে শুরু করে আমি পর্যন্ত সবাই এসব ব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রায় সবই নিজেরা করতে পারি, করি। তারপরেও পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, ভালবাসার অভাব নেই। একসময় আমার মনে হত শুধুমাত্র পারিবারিক ট্র্যাডিশনের জন্যেই সংসার জীবনে আমি সুখী হতে বাধ্য। আমার সাথে মাঝে গুলিয়ার যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল তার একটা অন্যতম কারণ ছিল আমার এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।
সুধীর দা মারা গেল ২০১১ সালের ০১ ফেব্রুয়ারি। রঞ্জিত দাকে দিয়ে শুরু, তারপর দীর্ঘ দুই বছর মৃত্যুর মিছিল। একে একে চলে গেল তিন জন। এক কালে কোলাহল মুখর বাড়িতে ধীরে ধীরে নেমে এলো কবরের স্তব্ধতা। সেই ১৯৯১ থেকে শুরু করে বাবা, মা, সুধীর দা - সবাই অনেক রোগে ভুগে হারিয়ে গেল। এদের দেখাশুনার মূল দায়িত্ব পড়েছে বউদি, দিদি আর রতনের কাঁধে। ক্রমাগত বিপর্যয় রতনকে সংসার গড়ে তুলতে দিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সুধীর দা যখন মারা গেল, রতন বিয়ে করল। আমাদের ভাইদের মধ্যে একমাত্র আরেঞ্জ ম্যারেজ। আসলে ওটা না করালে হয়তো ওর আর নিজের থেকে বিয়ে করা হয়েই উঠত না। সুধীর দা শেষের দিকে কী শারীরিকভাবে, কী মানসিকভাবে এতটাই ভেঙ্গে পড়েছিল যে মনে হত এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই অনেক ভালো।
সুধীর দা মারা যাবার পরে কয়েকবার দেশে যাই। দেখা হয় ওর অসংখ্য ছাত্রদের সাথে। সবাই এখনও প্রচণ্ড শ্রদ্ধার সাথে ওকে স্মরণ করে। ও যেমন গরীব ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এমনকি নিজের পকেটের টাকায় বই কিনে অনেককে সাহায্য করেছে, ওর অনেক ছাত্রকেও দেখেছি অন্যদের পাশে দাঁড়াতে। ১৯৯২ সালে আমার ক্লাসমেট রানা আমেরিকা চলে যাবার সময় আমার কাছে কিছু বই রেখে যায়। এর একটা ছিল গীতা। ওখানে একটা শ্লোক আছে "ফলের চিন্তা না করে নিজের কাজ করে যাও" যার পাশে রানা লিখেছিল "হাস্যকর"। তখন তেমন বুঝতাম না, পরে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের মত করে সেই শ্লোকের ব্যাখ্যা করেছি, "নিজের কাজকে উপভোগ কর, কাজের আনন্দে কাজ কর। যদি কাজ করে আনন্দ পাও ফল আসবেই।" শুধু কি তাই, যদি সবাই নিজের নিজের কাজটা ঠিক মত করে তাহলে সমাজ এমনিতেই উন্নত হতে বাধ্য। এক সময় মনে হত ভালো কিছু করার জন্য সংগঠন বা সমষ্টির বিকল্প নেই, কিন্তু সুধীর দাকে দেখে বুঝলাম, যদি ইচ্ছে থাকে, চেষ্টা থাকে একাই সমাজটাকে অনেকটাই বদলে দেওয়া যায়। অন্তত অনেক ভালো মানুষ তৈরি করা যায় যারা তোমার পতাকা সামনে নিয়ে যাবে। আমরা অন্যান্য ভাইয়েরা, যারা সব সময় সামাজিক কাজকর্মে অগ্রণী ছিলাম, তারা সবাই মিলে যা করতে না পেরেছি, সুধীর দা শুধু ভালবেসে ছাত্র পড়িয়ে, তাদের মধ্যে বই পড়ার পোকা ঢুকিয়ে, নিজে উদাহরণ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা হলেও নতুন মানুষ গড়তে সাহায্য করেছে। তার শত শত ছাত্রছাত্রীর সম্মিলিত শক্তি যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে শক্তিশালী, কেননা তারা অন্যদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় কোন কিছু প্রত্যাশা না করে। হ্যাঁ, আমি নিজেও অনেকদিন থেকেই এ ভাবেই ভাবতে শুরু করি। তবে সুধীর দা মারা যাবার পরে বুঝতে পারলাম আমার জীবনে ওর প্রভাব কত। আমার বিশ্বাস ওর প্রভাব শুধু আমার জীবনেই নয় ওর ছাত্রদের অনেকের জীবনেও বেশ তীব্র। একজন শিক্ষক এর চেয়ে আর বেশি কীই বা আশা করতে পারে!
জানি না বাবা অন্যদের বলতেন কি না, তবে আমাকে সব সময়ই বলতেন বিবেকের কাছে সৎ থাকতে। বলতেন এমন কাজ করো না যাতে পরে নিজের কাছে নিজেকে লজ্জিত হতে হয়। কেননা অন্যকে ফাঁকি দেওয়া যায় কিন্তু নিজেকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। সুধীর দাকে দেখে মনে হয় বাবার বলা এ কথাটা ও জানত আর নিজের কাজটা অত্যন্ত সততার সাথেই করত। নিজের কাছে সৎ না থাকলে এত মানুষের কাছে সৎ থাকা যায় না, এত মানুষের ভালবাসা পাওয়া যায় না।
এটা লিখেছিলাম ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ইতিমধ্যেই অনেক জল বয়ে গেছে ভোলগা দিয়ে। দিদি মারা গেছে। অ বেঁচে থাকলে ঠিক ফোন করত, বলত সুধীর দার কথা, ওর শ্মশানে বাতি দেবার কথা। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় মানুষ, কিন্তু স্মৃতি ঠিকই ফিরে ফিরে আসে।
দুবনা, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৯ মার্চ ২০২৩ ভালোভাষায় প্রকাশিত হয়েছে
https://bhalobhasa.com/russiar-chirkut-part-16-by-cosmology-research-scientist-bijan-saha/
ছোটবেলার কথা আমার মনে পড়ে সেই ১৯৬৮ সাল থেকে। বড় মাস্টারমহাশয় আমাদের প্রাইভেট পড়াতেন। একদিন দিদিকে ঘষি দিয়ে ঢিল মারলে সেটা পড়ে ওনার গায়ে। এমন বকেছিলেন যে বি ক্লাসে ভর্তি হয়ে যখন ওনাকে দেখি সামাদকে বেত দিয়ে মারছেন, সেই যে স্কুল ছাড়ি, পরবর্তী এক বছর আর ও মুখী হইনি। সে সময় মা অসুস্থ। আমার দিন কাটে বড়দা আর বৌদির ওখানে। রাতের বেলা বাড়ি ফিরি। বিকেলে কাকা বা মা গল্প শোনান। কাকা বলেন রামায়ণ আর মহাভারতের গল্প, মা লক্ষ্মীর পাঁচালি বা বসুমতির গল্প। কাকার গল্পে তাড়কা রাক্ষসী ছিল বহিরাগত। মার গল্পে দেব দেবীরা ঘরের মেয়ে হয়ে যেত। সে সময় বাড়িতে ছিলাম আমরা পাঁচ ভাই আর দিদি। সুবোধ দা আর স্বপন দা ইন্ডিয়া। মার গল্পে ওরা সব সময় থাকত, তাই দূরে থাকলেও চোখের আড়ালে থাকলেও মনের আড়ালে ছিল না। স্বপন দা ছিল হিরো। আমার বয়স যখন ছয় মাস বাড়িতে ডাকাত পড়ে, বাবা মা অজ্ঞান, ডাকাতরা আমাকে ন্যাকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে কেরোসিন ঢেলেছে আগুন লাগাবে বলে। তখন স্বপন দা ওদের কাছ থেকে আমার জীবন ভিক্ষা করে। আর সেই যে ভয় পায়, ক' দিন পরেই চলে যায় কোলকাতায়। এর পর ও আর দেশে ফেরেনি।
ও সময় বিশাল বিছানায় ঘুমুতাম তপন দা, কল্যাণ, রতন, দিদি, আমি আর মা। আর বাবা শুতেন আমাদের পায়ের কাছে। এর পর ধীরে ধীরে তপন দা কাছারি ঘরে চলে যায়। সেই যাওয়া পরে দীর্ঘ দিন ধরেই চলে। এক সময় কল্যাণ দা চলে যায় ইন্ডিয়া। ঘর খালি হতে থাকে।
যদিও সুধীর দা দেশেই ছিল ওর সাথে দেখা তেমন হত না। ও তখন ঢাকা কলেজ শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে গণিতে। বাড়িতে তেমন আসে না। আসলে সে সময় ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার ঝক্কি অনেক। তিন তিনটে বাস বদলাতে হয়, তিন তিনটে নদী পার হতে হয়। তাই ও প্রায়ই যেত মির্জাপুর মামার ওখানে। পরে অবশ্য জেনেছি ও যতটা না মামাবাড়ি যেত তার চেয়ে বেশি করে যেত প্রেম করতে। ১৯৬৯ সালে কোলকাতা যাবার আগে মা তো ওর বিয়ে ঠিক করে গেলেন। ফিরে এসে শুনলাম ওর মত বদলিয়েছে। এখন তার নতুন ভালবাসার মানুষ। বাড়িতে অশান্তি, মা অনড়। ছেলে তার নিজের পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করবে। বাড়ি এল নতুন বউদি - শুক্লা বউদি। ডাকনাম আলতা। দুধে আলতার মত তার গায়ের রং। সময়ের সাথে সে আর বাড়ির বউ রইল না, হল বাড়ির মেয়ে। তখন থেকেই সুধীর দা বাড়ি থাকতে শুরু করল। কাছে থেকে ওকে দেখার সুযোগ পেলাম। আসলে আমাদের সবার জন্য মা ছিলেন দেওয়ালের মত। আমি বাবার ন্যাওটা। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা আর সমীহের শেষ নেই। মা সেদিক থেকে যতটা না মা তার চেয়ে বেশি খেলার সাথী। কিন্তু কোন রাতে যদি মন খারাপ হত, মনে মনে ভাবতাম বাবা রাগ করে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন, কল্পনায় মাই তখন এগিয়ে আসতেন। মা ছিলেন আশ্রয়ের স্থল। সবার জন্যেই। বাবা আমাদের বকতেন না খুব একটা, তবে বকলে মা হতেন উদ্ধ্বারকারিনী। আমার এখনও অবাক লাগে ভেবে এমন কেন ভাবতাম।
সুধীর দার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৫ নভেম্বর মানে আমার চেয়ে ও প্রায় ২০ বছরের বড়। মনে পড়ে ওর বিয়েতে বউদিদের পক্ষ থেকে একটা টি সেট দিয়েছিল। একান্নবর্তী বড় বাড়ির এই ছোট্ট অংশে যৌতুক নেবার রেওয়াজ ছিল না। রতন বাদে সবাই বিয়ে করেছে প্রেম করে, তাই যৌতুকের প্রশ্ন আসেনি কোনদিন। যাহোক, আমি ওই টি-সেট থেকে নিজের জন্য একটা কাপ বেছে নিয়েছিলাম। সুধীর দা তখন ছাত্র পড়ায় আর মাস্টারি করে বানিয়াজুরি হাই স্কুলে। সকালে রান্না ঘরে চুল্লী ঘিরে বসে চায়ের আসর। বিকেলের চা মূলত বারান্দায়, কখনও আমাদের এদিকটায়, কখনও বড়দার ওখানে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের জন্য সবাই বসে থাকি চুলার পাশে। একদিন তাড়াহুড়ো করে সুধীর দা আমার কাপে চা খেলে আমি অন্য একটা কাপ থেকে ওর মাথায় গরম চা ঢেলে দিই। খুব রেগে গেছিল, তবে কিছুই বলার সুযোগ পায়নি। বাবা, মা, কাকা, জ্যাঠার রায় - ওর ভুল ছিল আমার কাপে চা খেয়ে। তবে এ নিয়ে আমার প্রতি ওর ভালবাসা কমেনি। প্রতিদিনই চুয়িং গাম, চকলেট, বিস্কুট এসব আনত আমার জন্য। ও কিন্তু কখনই আমাদের সাথে খেলাধুলা করত না। বড়দা থেকে শুরু করে আমরা সবাই যখন এক সাথে ফুটবল, ভলিবল খেলতাম - সুধীর দা হয় বই পড়ত বা চা খেত অথবা ছাত্র পড়াত। রাস্তা ভাংলে বা জল এলে আমরা যখন সবাই মিলে রাস্তায় মাটি তুলতাম, খালের উপর সাঁকো তৈরি করতাম - সুধীর দা বই নিয়ে পড়ে থাকত। তবে রাজনৈতিক মন্তব্য করত বিশেষ করে বিবিসির খবর শোনার সময়। পরে আমরা যখন বাম রাজনীতি শুরু করি, তখনও ও ছিল নির্বিকার, রাজনীতি বিমুখ। তবে যেটা করত তা হল বই কিনে আমাদের পড়তে দিত। ওর হাত ধরেই আমার পরিচয় বিশ্ব সাহিত্যের সাথে। এরপর জন্মদিনে কৃত্তিবাসী রামায়ণ আর কাশিদাসী মহাভারত দেয়। এরপর প্রায়ই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, দস্তয়েভস্কি, তুরগিনেভ এসব দিতে শুরু করে। তবে এ ব্যাপারে শুধু সুধীর দাই নয়, বাড়ির অন্যেরাও উৎসাহ দিত। আর ছিলেন পণ্ডিত স্যার। সুধীর দা বা পণ্ডিত স্যার কোন বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন
এই বইটা পড়িস।
যতদূর জানি, আমাদের স্কুলের অনেককেই পাঠ্য পুস্তকের বাইরের বই পড়তে আগ্রহী করে তোলেন এই দুজন। আমাকে সব সময় বিশ্ব সাহিত্যের নাম করা লেখকদের বই পড়তে দিলেও সুধীর দা ডিটেকটিভ পড়তে পছন্দ করত। মাসুদ রানা, বেনহুর, নীহার রঞ্জন - এসব বই বগলদাবা করে হাঁটত। আর ঘর থেকে বেরুনোর সময় কিছু চাল আর একটু লবন মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বেরিয়ে যেত। সুধীর দা আর বউদি যে ঘরে থাকত তার নাম ছিল বড় ঘর। ওখানেই কুলের ঠাকুর দেবতা ঘুমুত, খেত। ওই ঘরেই থাকত বস্তা ভরা লবন, চিনি, কোলা ভরা গুড় আর ড্রাম ভরা চাল, ডাল ইত্যাদি। ওর এই চাল আর লবন খেতে দেখে আমরা মুচকি মুচকি হাসতাম। আমি সে অর্থে ডিটেকটিভ একদমই পড়িনি। একটাই বই পড়েছি, হত্যা হাহাকারে। তবে দস্তয়েভস্কি, কাম্যু, কাফকা, সারত্রে পড়ে আমি যেন ডিটেকটিভ পড়ার আনন্দ পেয়েছি। স্কুলে থাকতেই কোলকাতা থেকে অংক আর পদার্থবিদ্যার বই এনে পড়তে দিত।
এই অংকগুলো করিস তো। পরে যখন ছাত্র পড়াতে শুরু করে আমাকে বলত অন্যদের সাহায্য করতে।
দেখ তো অংকটা মিলছে না। তোর হয় কি না?
ধীরে ধীরে আমরা হই কলিগ। একবার মনে আছে স্কুলে সুধীর দা আর ক্ষিতিশ স্যারের মধ্যে বিতর্ক শুরু হল দ্বিঘাত সমীকরণ নিয়ে। আমি ক্লাস টেনে পড়ি। দুজনে এসে আমার মতামত জানতে চাইলেন। ভারি মুস্কিল। সুধীর দা আমাদের প্রতিটি অংক বিশ্লেষণ করে শেখায়, ক্ষিতিশ স্যার ফর্মুলা অনুযায়ী। কেউ ভুল করছে না। তাই বললাম
আসলে আমরা যদি জানার জন্য পড়ি তাহলে বিশ্লেষণ করে পড়াই ভালো আর যদি নম্বরের জন্য পড়ি ফর্মুলাই যথেষ্ট। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের প্রাইওরিটি কি?
কেউই অখুশী হন নি।
ক্লাস টেনে আমাদের প্রথম ক্লাস নিতেন পণ্ডিত স্যার। আমি প্রতিদিনই লেট করতাম। তবে জানালা দিয়ে দূরে আমাকে আসতে দেখে উনি আমাকে প্রেজেন্ট করে রাখতেন। আমার মনে হয় তখন আমি ছিলাম লেনিনের বিখ্যাত "এক পা আগে দুই পা পিছে" বইয়ের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত উদাহরণ। তবে এটা ঠিক গবেষণার কাজ তাড়াহুড়ো করে করতে নেই, এমন কি কাজ শেষ করেও বারবার প্রশ্ন করতে হয়। হয়তো এভাবেই আমার মধ্যে গবেষণা করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। সুধীর দার ক্লাস ছিল পরে। কোন কোন দিন প্রথম ক্লাস থাকলে নাম ডাকত। ও জানতো আমি ওকে ইয়েস স্যার বলব না। আর সবাই সেই অপেক্ষায়ই থাকত আমি কী বলব, ইয়েস স্যার না ইয়েস দাদা। আমি ছিলাম ফার্স্ট বয়। ও আমাকে বাদ দিয়ে বিচিত্রকে দিয়ে শুরু করত। আমাদের সময়ে ভালো ছাত্ররা ক্লাস এইট থেকে মানিকগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে পড়তে যেত। আমি অবশ্য তেমন ভাবিনি। সুধীর দা নিজেই বলল
নিজের পড়াটাই আসল। তুই তো এখানেই পড়াশুনা করছিস। মানিকগঞ্জ গিয়ে কী হবে?
আবার যখন স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা উঠল, ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে গিয়েও ফিরে এলাম। তখন স্টার মার্ক থাকলে ভর্তিতে সমস্যা হত না, তবে হোস্টেলে সীট পাওয়া সমস্যা। রামকৃষ্ণ মিশনে অনেকেই থাকত। ততদিনে অবশ্য ঈশ্বর আর আমার পথ দুটো দিকে গেছে বেঁকে। ভর্তি হওয়া হল না। সুধীর দাও চায়নি আমি বাড়ি ছেঁড়ে কোথাও যাই। আসলে অংকের প্রতি আমার বরাবরই দুর্বলতা ছিল। সুধীর দা আর তপন দা গণিতে মাস্টার্স করে তাই আমার পদার্থবিদ্যা বেছে নেওয়া। মস্কো আসি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। এয়ারপোর্টে নেমেই বলি সাবজেক্ট বদলে পদার্থবিদ্যায় যাব। ছাত্র সংগঠনের প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হয়েছিল। পরে শিক্ষকদের কেউ কেউ রসায়নে, কেউ কেউ গণিতে পড়তে বলেছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আমি পদার্থবিদ্যার প্রেমে পাগল। আমি মস্কো আসি রাজনৈতিক কারণে। তখন ছাত্র ইউনিয়ন আর খেলাঘর নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে বাবা প্রমাদ গুনলেন। এর আগে স্বপন দা নক্সাল করে বাড়ির সবাইকে অনেক দুশ্চিন্তায় রেখেছে। তাই বাবা বললেন
দেশ ছাড়তে হবে। যদি চাও আমেরিকা যেতে পার অথবা রাশিয়া, যেহেতু সেই রাজনীতিই করছ। কিন্তু দেশে থাকা হবে না।
সুধীর দা আমার আমেরিকা যাওয়ার পক্ষে ছিল। আমরা যারা বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম তারা রাশিয়ার পক্ষে। তাছাড়া রাশিয়ার প্রতি আমার ভালবাসা যতটা না সমাজতন্ত্রের জন্য তার চেয়ে বেশি করে দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ - এদের লেখা থেকে। এমন কি রাশিয়ায় আসার পরেও কালেভদ্রে সুধীর দা চিঠি লিখলে আমি যেন আমেরিকা চলে যাই সেটাই বারবার বলত আর আমিও অমল দা, গণেশ দাদের উদাহরণ দিয়ে ওর সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করতাম।
সুধীর দার সাথে আমি নিজের মিল খুঁজে পাই মনিকার জন্মের পরে। এ দেশে অনেকের বিয়ের আগেই বাচ্চা হয়, বাচ্চা হবার পরেও অনেকেই অফিসিয়ালি বিয়েও করে না আবার বিয়ের পরেও অনেকেই বাচ্চা নেয় না। আমাদের দেশে বিয়ে মানেই বাচ্চা। বিয়ের অনেকদিন পরেও যদি বাচ্চা না হয়, শুরু হয় কানাঘুষা। আর সেটা যত না করে বাড়ির লোক তার চেয়ে বেশি পাড়া প্রতিবেশি। অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে কেন যে এত আগ্রহী আমাদের দেশের মানুষ?
অনেক দিন পর্যন্ত আমিই ছিলাম বাড়ির ছোট সন্তান। এর মধ্যে অবশ্য সুবোধ দা আর ভাগবত দার সন্তান হয়েছিল, তবে ওরা থাকত ইন্ডিয়া, তাই সুধীর দার বিয়ের পরে সবাই নতুন মুখের আশায় বসে ছিল। তবে সেটা খুব তাড়াতাড়ি হয়নি। ভ্রমরের জন্ম ১৯৭৫ সালে। আমার বয়স তখন ১১। সুধীর দা মনে হয় পুত্র সন্তান হবে বলে আশা করেছিল, তাই প্রথম প্রথম প্রায়ই খিটিমিটি করত। কিন্তু তারপর ভ্রমরকে এমন ভাবে ভালবেসে ফেলে যে যাকে বলে ভ্রমর অন্ত প্রাণ। সেই ছোটবেলা থেকেই ও ভ্রমরকে বোঝাতে চেষ্টা করত আর ভ্রমর না বুঝলে রেগে যেত। একদিন হঠাৎ শুনি ভ্রমরের কান্না। সুধীর দা কী যেন বলছে আর ভ্রমর শুনছে না। বউদি স্কুলে। সুধীর দা বলছে, "এবার তোকে খুন করে ফেলব।" আমি দৌড়ে গিয়ে সুধীর দাকে ধাক্কা দিয়ে ভ্রমরকে নিয়ে আসি। না আমি না সুধীর দা - কেউই এমন আচরণ আশা করি নি। অনেক পরে মনিকা দুবনা আসে মাত্র দুই বছর বয়সে। গুলিয়াকে মাঝে মধ্যে আন্তনকে নিয়ে মস্কো যেতে হত নাচের ক্লাসে। আমি মনিকাকে বুঝিয়ে কিন্ডার গারটেনে পাঠানোর চেষ্টা করতাম আর ও কিছুতেই যেতে চাইত না। আমার অফিস যাওয়া হত না। মাঝে মধ্যে প্রচণ্ড রেগে যেতাম, শাস্তিও দিতাম। সুধীর দা ভ্রমরকে কোলে নিয়ে প্রায়ই গান করত, গান মানে অসংলগ্ন শব্দাবলী। আমিও অবাক হয়ে দেখতাম, মনিকা, ক্রিস্টিনা বা সেভাকে কোলে নিয়ে আমি সুর করে গাইতাম, গুলিয়া যাকে বলত, "স্তো ভিঝু তো ই পাইয়ু" মানে যা দেখি তাই গাই। তখন নিজের ভেতর সুধীর দার ছবি খুঁজে পেতাম। এটা ছিল অবাক করা কাণ্ড। সুধীর দা চাকরি শুরু করে ১৯৭০ সালে। কিন্তু বাড়ির অবস্থা ভালো থাকায় কোন টাকা পয়সা বাড়িতে দিতে হত না। ওর টাকা করচ হয়ে যেত বই আর চায়ের দোকানে। এমন কি যখন অনেক ছাত্র পড়াতে শুরু করে আর উপার্জন বাড়ে তখনও এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। যারা প্রাইভেট পড়ে টাকা দিত দিত, না দিলেও কোন কথা ছিল না। ছাত্ররা গরীব হলে টাকা তো নিতই না উল্টো ওদের বই কিনে দিত। পড়ানোর আনন্দেই ও পড়াত। তাই বাবা মা কখনই ঠিক ওর উপর ভরসা রাখেননি। বাবা মার ভরসা ছিল পরবর্তী সন্তানদের উপর, যারা রাজনীতি করত, সামাজিক কাজকর্মে এগিয়ে যেত। এক কথায় আর দশ জনের মত ছিল। সুধীর পাগলার মত ছিল না। আশ্চর্যের ব্যাপার পাগল উপাধিটা সুধীর দার সাথে সাথে আমার ভাগ্যেও জুটেছিল বাড়িতে থাকতেই। তবে সেখানে আমি সুধীর দার সাথে মিল খুঁজে পেতাম না, ছিল আমার এক্সেন্ট্রিক ব্যবহার। তবে কেউই বাবা মার আশা পূরণ করতে পারেনি আর পরবর্তী পর্যায়ে সুধীর দা, বউদি আর দিদি সংসারের হাল ধরে।
১৯৮৯ সালে মাস্টার্স কমপ্লিট করে যখন দেশে ফিরি সুধীর দা অনেক বলে কয়ে আমাকে আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে পাঠাল বার দুয়েক। সে সময় কমরেডরা আর কমরেড নেই, আমি নিজেই রেনেগেড হয়ে গেছি, তাই মস্কোর হাতছানি ছিল আবার তেমন পিছুটানও ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত মস্কো ফিরে যাই পিএইচডি করার জন্য। ওই সময় আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। বাড়িতে টেলিফোন ছিল না, আজকের মত ইন্টারনেট ছিল না। তাই অন্যেদের সাথে যোগাযোগ থাকলেও ওর কাছ থেকে আলাদা করে চিঠি পেতাম না। ১৯৯১ সালে যখন দেশে যাই বাবা মারা গেছেন। সময় কেটেছে চুপচাপ বসে থেকে। ১৯৯৭ সালে আবার যাই মূলত পুনায় একটা কংগ্রেসে যোগ দিতে। তখন আমি অলরেডি দুবনায় চাকরি করি। এবার মাও মারা গেছেন। এক কথায় দেশের সাথে নাড়ির সম্পর্ক হালকা থেকে হালকাতর হয়ে আসছে। নিজেও ব্যস্ত কাজ আর সংসার নিয়ে। আসলে এখানে যখন বিয়ে করে থেকে যাই, তখন সুধীর দা বুঝতে পারে আমি আর আমেরিকা যাচ্ছি না, তাই আমাকে নিয়ে ওর আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে। এরপর নতুন শতাব্দীতে ইন্টারনেটের কল্যাণে নতুন করে যোগাযোগ হয় বাড়ির সাথে। গ্রামীন ফোন আসে। আমরাও অল্প পয়সায় ফোন করার উপায় খুঁজে পাই। ইতিমধ্যে ভ্রমর ইউনিভার্সিটি শেষ করে বিয়ে বসেছে, কিছু দিন দেশে কাজ করে ওরা চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া ২০০৫ এর শুরুতে। সব মিলিয়ে সুধীর দা ভেঙ্গে পড়েছে মানসিক ভাবে। পরে শুনেছি দেশে কী সব ঝামেলায় ও মহিলা কলেজের চাকরি ছেঁড়ে দেয়, অনেক দিন বহরমপুর মামার ওখানে থাকে। সেখানে ওর ছাত্ররা আজও নাকি সেই স্যারের কথা স্মরণ করে। এরপর দেশে ফিরে চাকরি না খুঁজে প্রাইভেট পড়াতে শুরু করে মানিকগঞ্জ একটা রুম ভাড়া করে। আমি দেশে থাকতেই দেখেছি ও শুধু স্কুল কলেজের ছাত্রদেরই নয়, ইউনিভার্সিটির অনার্স বা মাস্টার্স কোর্সের ছাত্রদেরও পড়াত। কঠিন জিনিস সহজ করে বোঝানোর এক অদ্ভুত শক্তি ছিল ওর। সেই ছোটবেলা থেকেই একটা কথা চালু ছিল বাড়িতে - সুধীর অতিরক্ত চা খেয়ে লিভার নষ্ট করে ফেলেছে। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট ভোগ করেছে লিভার নিয়ে। প্রায়ই হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০০৭ এর পর থেকেই যাকে বলে যমে মানুষে টানাটানি। এর মধ্যে কোন রকম পূর্বাভাস না দিয়ে ২০০৯ সালে বৌদির মৃত্যু। এরপর ফোন করলেই বলত, "বিজন আমি আর বাঁচতে চাই না। আর বাঁচব নারে।" মানুষ যখন জীবনকে ভালবাসতে ভুলে যায় তখন তাকে জীবনে ফিরিয়ে আনা কষ্ট। ২০০৯ সাল ডিএসসি ডিফেন্ড করার পর মস্কোর বাংলাদেশী সমাজে আমার কদর কেমন করে যেন বেড়ে যায়। যদিও আমি নিজে কোন রকম পরিবর্তন খুঁজে পাইনি, তবে বন্ধুরা কী যেন দেখতে পেয়েছিল। শুরু হল যোগাযোগ, ফোন নম্বর বিনিময়। কেউ কেউ সংগঠন করা যায় কিনা সেটা বলে। গুলিয়া তখন বাচ্চাদের নিয়ে মস্কো চলে এসেছে, তাই সংগঠন মানে মস্কো আসার অজুহাত। আমিও যেন হাতে চাঁদ পেলাম। ২০১০ সালে পালন করলাম বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। সাড়া পেলাম অভাবনীয়। শুরু হল বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ, রাশিয়া গঠনের কাজ। তখন মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত আর মিনিস্টার দুজনেই আমাদের ভিপুস্কনিক, মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাশ করা। আমাকে বলা হল আমাদের সংগঠন করার কথা তাঁদের জানাতে। তোমরা যে সংগঠন করতে চাইছ এরা (মস্কোর বাঙ্গালী সমাজের কিছু হোমরাচোমরাদের নাম বললেন) এটা করতে দেবে।
আমরা জনা দশেক মানুষ এক হয়েছি সংগঠন করব বলে। আমাদের ঘোষণা পত্র থাকবে বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য রেখে। যদি কেউ আমাদের সাথে আসতে চায়, ওয়েলকাম। আমরা কারও বিরুদ্ধে কিছু করছি না। শুধু নিজেদের স্বপ্নের কথা বলার জন্য একটা সামাজিক ফোরাম তৈরি করছি।
এরপর শুরু হল রাজনীতি। দূতাবাস থেকে চাইলো আমরা যেন ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করি। রাষ্ট্রদূত ফোন করলে বললাম, "আজ আপনারা ক্ষমতায় তাই বঙ্গবন্ধুর নাম লিখতে বলছেন। দুদিন পরে অন্যেরা ক্ষময়ায় এসে যদি এ নাম সরাতে বলে বা অন্য নাম বসাতে বলে তখন আমরা কী করব?" বোঝা গেল কথাটা তাঁদের মনপুত হয়নি। আমরাও সংগঠনের ঘোষণাপত্র আর গঠনতন্ত্র নিয়ে স্থবিরাবস্থায় পড়ে গেলাম। অনেকের মতে অন্য সংগঠনের কেউ আমাদের সংগঠনের কমিটিতে নির্বাচিত হতে পারবে ন। আমার যুক্তি "দেখ, আমাদের সংগঠনের যেকোনো সদস্যের সমান অধিকার থাকা উচিৎ, মানে যে কেউ যেকোনো পদে নির্বাচিত হতে পারে। কিন্তু একবার যদি কেউ নির্বাচিত হয় তখন বলতে পার, এখন তোমার দায়িত্ব অনেক বেশি, তাই তুমি অন্য সংগঠনের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হতে পারবে না।" কিন্তু এই সহজ কথাটা বোঝানও সহজ হল না। মানুষ আসলে দল করার আগেই দলীয় আঁতর গায়ে মাখে। বড় বড় আদর্শের বুলি - এটা তোতা পাখির বুলি বই কিছু নয়। যাহোক ২০১০ সালের ৪ জুলাই প্রবাসী পরিষদ আত্মপ্রকাশ করল আর ওই বছর ২৪ ডিসেম্বর আমরা একটা কম্প্রমাইজে এসে সংগঠনের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র গ্রহণ করলাম। পরের দিন আমার আর শাহীনের জন্মদিন। তাই দুজনে চলে গেলাম ওর বাসায়।
সে সময় আমাদের মত সাধারণ চাকুরিজীবীদের পকেটে স্মার্টফোন আসেনি। ই-মেইল চেক করতে হয় ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে। শাহীন আমাকে ওর ল্যাপটপ দিয়ে গেল রান্না করতে। দেখি তপন দার মেইল। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। বেশ বড় চিঠি। এক জায়গায় লিখেছে সুধীর দা তো বছর পাঁচেক আগেই মারা গেছে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। আবার যে চিঠিটা পড়ব সে শক্তি পর্যন্ত রইল না। পরের দিন ঘুম ভাংতেই দিদিকে ফোন করলাম।
আচ্ছা সুধীর দা পাঁচ বছর আগে মারা গেছে সেটা বলিস নি কেন?
তোকে এ কথা কে বলল। তুই না সেদিনও ওর সাথে কথা বললি।
তোরা কাউকে দিয়ে সুধীর দার গলায় কথা বলিয়েছিস।
ছোটবেলায় আমার প্রায়ই মনে হত মা বোয়াল মাছ বা অন্য মাছ কেটে রুই বা কই মাছ বানিয়ে আমাকে খেতে দেন। এখনও সেটাই মনে হল।
ভাই, তুই আমার কথা বিশ্বাস করছিস না কেন? কথা বলবি। দাদা তো বাড়িতেই।
না।
অনেকক্ষণ থ হয়ে বসে রইলাম। তারপর এক সময় চিঠিটা আবার পড়লাম। ওখানে লেখা ছিল সুনীল দার মৃত্যুর কথা। কমরেড সুনীল রায়। উনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। মনে হয় কোন একসময় আমি নিজেই সুনীল দার কথা জানতে চাইছিলাম। তপন দা সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছে। আর আমি ভুল করে সুনীল দার পরিবর্তে সুধীর দা পড়ে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়েছি। সে রাতে মস্কোয় বরফ বৃষ্টি হয়েছে। শাহীনের গাড়ির কাঁচ আইস মানে বরফে ঢাকা। অনেক কষ্ট করে কাঁচ পরিস্কার করা গেল। শাহীন আমাকে আকাদেমিচেস্কায়ায় বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমি একটা কেক কিনে গেলাম বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে।
যতদূর শুনেছি পরের দিকে সুধীর দা রাজনীতি করত, রাজনীতি মানে আওয়ামী লীগ। করত সক্রিয় ভাবেই। শুনেছি একবার যখন শেখ হাসিনা তরা হয়ে ঢাকায় যান সুধীর দা তাঁকে নেমে জনগণের সাথে কথা বলতে অনুরোধ করে। উনি রাজি হননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সুধীর দা নাকি মুখের উপর বলে দেন, যদি সাধারণ মানুষের সাথে নেমে কথা না বলতে পারেন আপনি আবার কিসের নেত্রী। সত্য মিথ্যা বলতে পারব না, তবে আমাদের বাড়ির কেউই এরকম ভাবে কারো মুখের উপর নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করে না। সুধীর দা সব সময়ই ছাত্রদের প্রিয় ছিল। ও নিজে যেমন ছাত্রদের ভালবাসত, ছাত্ররাও একই ভাবে ওকে ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত। ২০০২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ হয়। একদিন বিএনপি, জামাতের এরকম একটা দল মিছিল করে আসছিল তরা গ্রামের হিন্দুদের উপর আক্রমণ করার জন্য। ওই মিছিল থেকে এক ছাত্র দৌড়ে আসে আমাদের বাড়ি তার সুধীর স্যারকে সতর্ক করে দিতে। আর সাথে সাথে মজনু ভাইরা এসে বাড়ির সবাইকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এটা কী সাফল্য না ব্যর্থতা? একদিকে ছাত্রের ভালবাসা সুধীর দাকে আক্রমনের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। অন্য দিকে যে মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছে, তাদের ভালোবেসেছে, সেই ছাত্রদের একজন যদি ধর্মীয় উন্মাদনার শিকার হয়ে অন্য ধর্মের মানুষদের আক্রমণ করে সেটাও তো ওই শিক্ষকেরই ব্যর্থতা। শিক্ষক তো শুধু অংক বা কোন বিশেষ বিষয় শেখান না, ছাত্রদের সবার আগে মানুষ হতে শেখান।
সত্তরের দশকে আর আশির দশকের শুরুর দিকে পড়াশুনা ছাড়া আমার জীবনে সুধীর দার উপস্থিতি তেমন অনুভব করেছি বলে মনে হয় না। আসলে ও আমাদের বিভিন্ন রকম বই পড়তে দিত ঠিকই কিন্তু আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে কখনও অংশগ্রহণ করত না। আমাদের বাড়িতে পাকিস্তান আমল থেকেই আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ছিল, তবে কেউ সক্রিয় রাজনীতি করত না। তপন দা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত থাকলে থাকতেও পারত, তবে বাড়িতে এ নিয়ে কখনই কথাবার্তা বলত না। হয়তো সবাই তখন স্বপন দাকে নিয়ে চিন্তিত ছিল বলে। বড়দা বছরের ৯ মাস বাড়ির বাইরে থাকত। আগে নিজে যাত্রা দলে অভিনয় করত আর ১৯৬৯ সাল থেকে নিজেই অম্বিকা নাট্য প্রতিষ্ঠান নামে এক যাত্রার দল তৈরি করে। বড়দার উদ্যোগে আমি ১ কাঁচা টাকা দিয়ে মালিকদের একজন হতাম সেই দলের। বড়দা যখন বাইরে থাকত আমি থাকতাম তপন দার তত্ত্বাবধানে। ওর সাথেই খেতাম এক থালায়। ১৯৮০-১৯৮২ সালে আমি যখন কলেজে পড়ি একদিন কে যেন খবর দিল তপন দা অপেক্ষা করছে যতীন ঘোষের মিষ্টির দোকানে। গেলে ও আমাকে আজাহার ভাইএর সাথে আলাপ করিয়ে দিয়ে চলে গেল। এটা করেছে মনে হয় আমার উপর কোন রকম চাপ সৃষ্টি না করার জন্য। ক’ দিন পরে কলেজে নির্বাচন। আজাহার ভাই বললেন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে এজিএস পদে ইলেকশন করতে। ওই সময় দেবেশ নামে আমাদের এক এক ক্লাসমেট যে ছাত্র লীগ থেকে এজিএস পদে ইলেকশন করেছিল, বলেই বসলো, "বিজন দা যেদিন রাজনীতি করবে সেদিন সূর্য পশ্চিম দিকে উঠবে।" আমি রাজনীতি সচেতন ছিলাম, রেগুলার এ নিয়ে পড়াশুনা করতাম, সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহী ছিলাম কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করার ইচ্ছে কখনই ছিল না। আমার মনে হয়েছে ভালো বিশেষজ্ঞ হয়েই দেশের সেবা করা যায়। আজাহার ভাইকে আমি বললাম ভেবে দেখব। তারা যেন আমাকে ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে লিটেরেচার দেন পড়তে। পরে তুলু ভাই, লতিফ ভাই, দুলাল দা, পরেশ দা সহ অনেকেই আমাদের বাড়ি এলেন। অনেক কথা হল। কিন্ত আমার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেলাম না। ঠিক হল আমি ছাত্র ইউনিয়নের মেম্বারশীপ নেব না, তবে ইলেকশন করব। যদি এক সাথে কাজ করতে গিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর পাই, যোগ দেব। এরপর ইলেকশন করলাম। তবে সেই ইলেকশনের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। ওরা নিজেরাই আমার নির্বাচনী পোস্টার ছাপাল। তাতে লিখল যে আমি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি আর এসএসসি তে স্টার পেয়েছি। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাবার ব্যাপারটা ছিল মিথ্যে। আরও একটা ব্যাপার হল নির্বাচনের আগে আগে। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্কলারশীপ দেবার ব্যাপারে কলেজে ঘোষণা করা হল। ব্যাপারটা দাঁড়ালো আমি যেন স্কলারশীপের জন্য নির্বাচন করছি। আমার বিশ্বাস আমি নিজের রেজাল্ট দিয়েই সেটা করতে পারতাম। এ ধরণের কাজকর্ম আমাকে ব্যথিত করেছিল। আমার কলেজ জীবন নিয়ে পরে কখনও লিখব। ধীরে ধীরে জড়িত হলাম খেলাঘরের সাথে। গ্রামে খেলাঘর আসর করলাম। রতন শুরু করল খেলাঘর আর উদীচী করা। এক কথায় আমাদের ঘরে বাম রাজনীতি ঢুকল। ঢাকা থেকে সুনীল দা, লেনিন ভাই, মানিকগঞ্জের আজাহার ভাই, হজরত ভাই, প্রমথ দা সহ বাম ঘরানার রাজনীতিবিদদের জন্যে বাড়ির দ্বার খুলে গেল। সুধীর দা ছিল তখন ডঃ কামাল হোসেনের অনুসারী। ফলে তপন দা বা রতন যেখানে শুধু ভাই নয় কমরেড হল, সুধীর দা শুধু দাদাই রয়ে গেল। এরপর মস্কো এলাম। এর আগে আমি অবশ্য বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলাম। এরশাদের দমন নীতির ফলে ক্লাস শুরু হয়েছিল অনেক পরে। একদিন ফিজিক্স ক্লাসে টিচারকে একটা প্রশ্ন করায় বললেন, "ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য এসব না জানলেও চলবে।" তখনই ঠিক করেছিলাম যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়া নাও হয়, পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হব। মস্কো আসার পরে যখন সাবজেক্ট চেঞ্জ করি বাবা নিজে কিছু না বললেও সঞ্জীব স্যারসহ অনেককে দিয়েই বলানোর চেষ্টা করেছেন বিষয় না বদলাতে। তবে সুধীর দা আমার পদার্থবিদ্যা পড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
সত্তর আর আশির দশকে বিদেশ যাওয়া আজকালের মত ডাল ভাত ছিল না। তখনও মধ্যপ্রাচ্যে এত লোক যেতে শুরু করেনি। আমাদের এলাকা থেকে হাতে গনা কিছু লোক বিদেশে পড়াশুনা করত। তবে এরপরে আমাদের স্কুলের অনেকেই বাইরে যায় বৃত্তি নিয়ে। বর্তমানে প্রায় সব বাবা-মাই চান ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়াশুনা করুক, সেখানেই সংসার পেতে বসুক। এই সূত্র ধরে অনেকেই বাইরে থেকে যায়, পেছনে রেখে যায় বৃদ্ধ বাবা মাকে। যে বাবা মার ইচ্ছা পূরণের জন্য সন্তান দেশছাড়া হয় তাকেই আবার অকৃতজ্ঞ বলে অভিযুক্ত হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ভ্রমর বিয়ে বসে, ওরা দুজন দেশেই অনেকদিন চাকরি করে আর এক সময় অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। সুধীর দা মনে হয় এটা ঠিক মেনে নিতে পারেনি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেড়াতে যায়নি। তখন থেকেই শুরু হয় এক ধরণের ডিপ্রেশন।
ইতিমধ্যে আমাদের আগের জেনারেশনের সবাই বিদায় নিয়েছেন। আমাদের জেনারেশনের বড়দি আর ভাগুদাও চলে গেছে। কিছুদিন আগে রঞ্জিত দা মারা গেল। রঞ্জিত দাও ছিল সুধীর দার মতই - সব হৈ হুল্লর থেকে দূরে। ও ও ফুটবল বা ভলিবল খেলত না। নাম ছিল ম্যারা বাবু। এমন কি বিয়ের পরেও বসে থাকত কখন মেজমা মুখে ভাত তুলে দেবে। বিএ পাস করে একটা স্কুলে পড়াত। তিন কন্যার জনক। তারপর অসুখ, অনেক দিন বাড়ি আর হাসপাতাল। আমাদের বাড়ি বরাবরই অনেক কুকুর ছিল, তবে যতদিন কুকুর ছোট ছিল আমরা সবাই ওদের আদর করতাম, এরপর ওরা হয়ে যেত বেওয়ারিশ। বাড়িতে খেত, ঘুমুত, রাতে কেউ গেলে ঘেউ ঘেউ করত, তবে যাকে বলা হয় অস্পৃশ্য ছিল। একমাত্র রঞ্জিত দাই ওদের সাথে একটু খেলাধুলা করত, গায়ে হাত বুলিয়ে দিত। সেই রঞ্জিত দা অসুস্থ। একদিন বাড়ি থেকে ফোন এলো।
রঞ্জিত দাকে বাড়ি নিয়ে এলাম, ডাক্তাররা আশা ছেঁড়ে দিয়েছে। কে জানে আর কতক্ষণ বাঁচবে। কথা বল।
কিরে রঞ্জিত দা, কি খবর? শরীর এখন কেমন?
তোর সাথে আর দেখা হল না। আর হয়তো বাঁচব না। মেয়েরা রইল, সবাই ওদের দেখে রাখিস।
২০০৮ সালে রঞ্জিত দা চলে গেল। বড়দি আর ভাগুদা মারা গেছে কোলকাতায়। রঞ্জিত দা ছিল বাড়ির ছেলে। ও, তপন দা আর বউদি পাশাপাশি বয়সের। আমাদের ছোটবেলা কেটেছে একসাথে গান বাজনা করে। দিদি, রতন আর এক সময় আমি গান শিখতাম, রঞ্জিত দা, কল্যাণ দা আর আমি তবলা শিখতাম। একসাথে সকাল বিকাল চা খাওয়া, গল্প করা। রঞ্জিত দা রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতে পারত। আজ ও চলে গেল। সবাই নতুন করে বুঝতে পারল এবার আমাদের জেনারেশনের চলে যাবার সময় এসেছে। কতই বা বয়স ছিল ওর তখন? ৫৫? বউদি অস্ট্রেলিয়া যায় ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ইশানের জন্মের পর পর। সুধীরদারও যাবার কথা ছিল। গেল না। বৌদির সাথে প্রায়ই ফোনে অনেক কথা হত। ওই সময় সুধীর দা গেলে অনেক কথাই বলা যেত। আমি ডিএসসি ডিফেন্ড করলাম ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর। দাদা বউদি সহ বাড়ির সবাই খুশি। অনেক বার বলেছে দেশে ঘুরে যেতে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে হয়ে ওঠেনি। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর বউদি চলে গেলে অপ্রত্যাশিত ভাবে। মনে নেই সেই সময় কেউ ফোন করেছিল নাকি পরবর্তীতে দিদি হাজার বার বলেছিল সেদিনের ঘটনা, মনে হয় সব যেন চাক্ষুষ দেখা। প্রতিদিন সকালে দিদি আর বউদি একসাথে বেরিয়ে যায় চাকরিতে। বউদি জাবরা গার্লস স্কুলে আর দিদি উথুলী গার্লস স্কুলে। দিদি ক্লাস নিচ্ছিল। হঠাৎ ফোন এলো জাবরা থেকে দিদি, বৌদির রক্ত বমি হচ্ছে। তাকে নিয়ে আমরা মানিকগঞ্জ হাসপাতালে যাচ্ছি। আপনি চলে আসেন।
সুধীর দা বাড়িতে অসুস্থ। রতন ঢাকা গেছে বিটিভির অডিশনে। এর মধ্যে অনেকেই খবর পেয়ে চলে এসেছে মানিকগঞ্জ। যেহেতু রক্ত বমি হয়েছে তাই মূল সন্দেহ পাকস্থলীর উপর। এক পর্যায়ে তারা রোগীকে ঢাকা নিয়ে যেতে বলে। পপুলারে (?) নিয়ে যাওয়া হয়। দুদিন যমে মানুষে টানাটানি। বানের জলের মত টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউই স্ট্রোক যে করতে পারে সেটা ভাবছে না। সঠিক ডায়াগনোসিসের অভাবে কত রোগী যে অকালে প্রাণ হারায়। এ ঘটনা যেন বাড়ির ভিত্তি নাড়িয়ে দিল। সবাই চিন্তিত ছিল সুধীর দাকে নিয়ে আর সেখানে এভাবে বউদি চলে গেল। কীভাবে দাদাকে জানানো হবে বৌদির মৃত্যু সংবাদ? বিশেষ করে ওর শরীরের যে অবস্থা। দিদি ফোন করে যতটুকু না কথা বলে তার চেয়ে বেশি কাঁদে।
দিদি, দেখত গত ২০ বছরে বাড়ির মৃত্যুগুলোর কথা স্মরণ করে। জ্যাঠামশাই, বাবা, কাকা, মা, খুড়ি মা, বড়মা, জেঠিমা, মেঝমা, বড়দি, ভাগুদা, রঞ্জিত দা সবাই অসুখে কীরকম কষ্ট করে মারা গেছে? বউদি তো বলতে গেলে কোন কষ্টই করেনি। এখন কী করবি। যদি এ অবস্থায় ঘরে পড়ে থাকত ব্যাপারটা কি ভালো হত।
জানি এভাবে বলতে নেই, তবে মাঝে মধ্যে কঠিন হলেও অনেক সত্য কথা বলতে হয়। সুধীর দা বৌদির মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। আমি ফোন করি
বিজন, এ কী হল? আমি আর বাঁচব না। বাঁচতে চাই না।
মরে যাওয়া তো অপশন হল না। ভ্রমর আছে। ওর ছেলে আছে। বউদি তোমাকে বাঁচানোর জন্য কি না করল। আর তুমি এখন বলছে বাঁচতে চাও না, এটা কোন কথা হল?
তুই কবে আসবি?
এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। সময়, সুযোগ, সামর্থ্য - কোনটাই নেই।
চাইলেই তো আসা যায় না। দেখি চেষ্টা করব।
পরবর্তী একটা বছর সুধীর দা হাসপাতাল আর বাড়ি করে কাটাল। এই ভালো তো এই খারাপ। মনে হয় ওই সময় যদি আবার ছাত্রদের কাছে ফিরে যেতে পারত তাহলে মনসিক কষ্টটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারত। মানিকগঞ্জে একটা ঘরও রাখা ছিল। কিন্তু শারীরিক বা মানসিক কোন ভাবেই ও এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। এ যেন বসে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। আশ্চর্যের ব্যাপার হল বাবা মাকেও দেখেছি পরস্পরের উপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল। একই ঘটনা ভাইদের ক্ষেত্রে। যদিও বাবা, সুবোধ দা, সুধীর দা এমনকি মনে হয় স্বপন দা নিজেও রান্না বান্না সহ বিভিন্ন কাজে বউদের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তপন দা থেকে শুরু করে আমি পর্যন্ত সবাই এসব ব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রায় সবই নিজেরা করতে পারি, করি। তারপরেও পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, ভালবাসার অভাব নেই। একসময় আমার মনে হত শুধুমাত্র পারিবারিক ট্র্যাডিশনের জন্যেই সংসার জীবনে আমি সুখী হতে বাধ্য। আমার সাথে মাঝে গুলিয়ার যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল তার একটা অন্যতম কারণ ছিল আমার এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।
সুধীর দা মারা গেল ২০১১ সালের ০১ ফেব্রুয়ারি। রঞ্জিত দাকে দিয়ে শুরু, তারপর দীর্ঘ দুই বছর মৃত্যুর মিছিল। একে একে চলে গেল তিন জন। এক কালে কোলাহল মুখর বাড়িতে ধীরে ধীরে নেমে এলো কবরের স্তব্ধতা। সেই ১৯৯১ থেকে শুরু করে বাবা, মা, সুধীর দা - সবাই অনেক রোগে ভুগে হারিয়ে গেল। এদের দেখাশুনার মূল দায়িত্ব পড়েছে বউদি, দিদি আর রতনের কাঁধে। ক্রমাগত বিপর্যয় রতনকে সংসার গড়ে তুলতে দিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সুধীর দা যখন মারা গেল, রতন বিয়ে করল। আমাদের ভাইদের মধ্যে একমাত্র আরেঞ্জ ম্যারেজ। আসলে ওটা না করালে হয়তো ওর আর নিজের থেকে বিয়ে করা হয়েই উঠত না। সুধীর দা শেষের দিকে কী শারীরিকভাবে, কী মানসিকভাবে এতটাই ভেঙ্গে পড়েছিল যে মনে হত এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই অনেক ভালো।
সুধীর দা মারা যাবার পরে কয়েকবার দেশে যাই। দেখা হয় ওর অসংখ্য ছাত্রদের সাথে। সবাই এখনও প্রচণ্ড শ্রদ্ধার সাথে ওকে স্মরণ করে। ও যেমন গরীব ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এমনকি নিজের পকেটের টাকায় বই কিনে অনেককে সাহায্য করেছে, ওর অনেক ছাত্রকেও দেখেছি অন্যদের পাশে দাঁড়াতে। ১৯৯২ সালে আমার ক্লাসমেট রানা আমেরিকা চলে যাবার সময় আমার কাছে কিছু বই রেখে যায়। এর একটা ছিল গীতা। ওখানে একটা শ্লোক আছে "ফলের চিন্তা না করে নিজের কাজ করে যাও" যার পাশে রানা লিখেছিল "হাস্যকর"। তখন তেমন বুঝতাম না, পরে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের মত করে সেই শ্লোকের ব্যাখ্যা করেছি, "নিজের কাজকে উপভোগ কর, কাজের আনন্দে কাজ কর। যদি কাজ করে আনন্দ পাও ফল আসবেই।" শুধু কি তাই, যদি সবাই নিজের নিজের কাজটা ঠিক মত করে তাহলে সমাজ এমনিতেই উন্নত হতে বাধ্য। এক সময় মনে হত ভালো কিছু করার জন্য সংগঠন বা সমষ্টির বিকল্প নেই, কিন্তু সুধীর দাকে দেখে বুঝলাম, যদি ইচ্ছে থাকে, চেষ্টা থাকে একাই সমাজটাকে অনেকটাই বদলে দেওয়া যায়। অন্তত অনেক ভালো মানুষ তৈরি করা যায় যারা তোমার পতাকা সামনে নিয়ে যাবে। আমরা অন্যান্য ভাইয়েরা, যারা সব সময় সামাজিক কাজকর্মে অগ্রণী ছিলাম, তারা সবাই মিলে যা করতে না পেরেছি, সুধীর দা শুধু ভালবেসে ছাত্র পড়িয়ে, তাদের মধ্যে বই পড়ার পোকা ঢুকিয়ে, নিজে উদাহরণ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা হলেও নতুন মানুষ গড়তে সাহায্য করেছে। তার শত শত ছাত্রছাত্রীর সম্মিলিত শক্তি যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে শক্তিশালী, কেননা তারা অন্যদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় কোন কিছু প্রত্যাশা না করে। হ্যাঁ, আমি নিজেও অনেকদিন থেকেই এ ভাবেই ভাবতে শুরু করি। তবে সুধীর দা মারা যাবার পরে বুঝতে পারলাম আমার জীবনে ওর প্রভাব কত। আমার বিশ্বাস ওর প্রভাব শুধু আমার জীবনেই নয় ওর ছাত্রদের অনেকের জীবনেও বেশ তীব্র। একজন শিক্ষক এর চেয়ে আর বেশি কীই বা আশা করতে পারে!
জানি না বাবা অন্যদের বলতেন কি না, তবে আমাকে সব সময়ই বলতেন বিবেকের কাছে সৎ থাকতে। বলতেন এমন কাজ করো না যাতে পরে নিজের কাছে নিজেকে লজ্জিত হতে হয়। কেননা অন্যকে ফাঁকি দেওয়া যায় কিন্তু নিজেকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। সুধীর দাকে দেখে মনে হয় বাবার বলা এ কথাটা ও জানত আর নিজের কাজটা অত্যন্ত সততার সাথেই করত। নিজের কাছে সৎ না থাকলে এত মানুষের কাছে সৎ থাকা যায় না, এত মানুষের ভালবাসা পাওয়া যায় না।
এটা লিখেছিলাম ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ইতিমধ্যেই অনেক জল বয়ে গেছে ভোলগা দিয়ে। দিদি মারা গেছে। অ বেঁচে থাকলে ঠিক ফোন করত, বলত সুধীর দার কথা, ওর শ্মশানে বাতি দেবার কথা। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় মানুষ, কিন্তু স্মৃতি ঠিকই ফিরে ফিরে আসে।
দুবনা, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৯ মার্চ ২০২৩ ভালোভাষায় প্রকাশিত হয়েছে
https://bhalobhasa.com/russiar-chirkut-part-16-by-cosmology-research-scientist-bijan-saha/
Thursday, March 2, 2023
বিবর্তন বাদ
স্কুলের পাঠ্যসূচী থেকে বিবর্তনবাদ বাদ দেওয়ায় সামাজিক মাধ্যম উত্তাল। বিবর্তনবাদ বিরোধীরা যেমন উল্লাসে ফেটে পড়েছে, বিবর্তনবাদের পক্ষের লোকজন তেমনি ফেটে পড়েছে ক্ষোভে। এই আনন্দ ও বেদনাকে উপেক্ষা করে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশ। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হলে তার মাশুল দিতে হয় দেশকেই।
বিবর্তনবাদের যারা বিরোধিতা করেন তাদের যুক্তি, কস্মিন কালেও তো কেউ কোন বানর থেকে তারা মানুষ হতে দেখেনি, তাহলে এটা সত্য হয় কি করে? কিন্তু তারা প্রশ্ন করে না যে ঈশ্বর যে প্রথম মানব তৈরি করেছেন সেটাও কেউই দেখেনি। তারা যদি সাক্ষ্য প্রমাণ বিহীন অনেক ঘটনায় বিশ্বাস করতে পারে তাহলে বিবর্তন তত্ত্বে এত আপত্তি কেন? এটাও তো একটা সম্ভাবনা মাত্র। তাছাড়া বিবর্তনবাদ বানর থেকে মানুষের উৎপত্তির কথা বলে না, সে বলে এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্যান্য প্রাণী তথা মানুষের উৎপত্তির কথা। আমরা নিজেরাই অনবরত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দুই প্রজন্মের আগের শিশু আর আজকের শিশু এক নয়, এক নয় সমাজ, সামাজিক বন্ধন। আমরা যদি সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন মেনে নিতে পারি – বায়োলজির ক্ষেত্রে সমস্যা কেন?
ধর্ম অতীত কেন্দ্রিক, সে অতীতে সব সমস্যার সমাধান দেখে। বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, সে শেষ কথা বলে না, একটু একটু করে সত্যের দিকে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞান জানে প্রতিটি নতুন জ্ঞান অনেক অজানার জন্ম দেয়। তাই তার যাত্রা অন্তহীন – সে শেষ কথা বলবে না, শেষ উত্তর দেবে না, আরও সঠিক, আরও নিখুঁত উত্তর পাবার জন্য এগিয়ে যাবে। তাই স্কুলে বৈজ্ঞানিক মতবাদ পড়ানোর সাথে সাথে ধর্মীয় মতবাদ পড়ালে বিজ্ঞানের অসুবিধা হয় না, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ধর্মীয় ব্যাখ্যা পড়তে সমস্যা হয় না, উল্টো সে তাতে সমৃদ্ধ হয়। কেননা বিজ্ঞানীর জন্য ভুল রেজাল্টও রেজাল্ট, এটা তাকে ভবিষ্যতে ভুল করার হাত থেকে রক্ষা করবে। ধার্মিকের সেই মহানুভবতা নেই, তার জন্য নিজের সত্যে আস্থা না রাখা আর ধর্মচ্যুত হওয়া সমার্থক। আর এ জন্যেই তার কাছে এটা অস্তিত্বের লড়াই। ধর্ম এখানে মহানুভব নয়।
বাহান্নতে আমরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি করেছিলাম, একমাত্র নয়। তাই আমরা মেহেদি হাসান বা গোলাম আলীর গজল শুনে নিজেদের ঋদ্ধ করতে পারি। যদি কেউ বাংলা বলে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল পড়া থেকে বিরত থাকে সেটা তার দীনতা। গণতন্ত্রের মূল কথা হল বিকল্প। বিকল্প না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না। আমরা পাঠ্যসুচী থেকে বিবর্তনবাদ তুলে দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করছি, মানুষের সার্বিক বিকাশে বাধা দিচ্ছি। মানুষের উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছে সে বিষয়ে রায় দেবার এখতিয়ার রাষ্ট্রের নেই। এ নিয়ে যদি একাধিক মতবাদ থাকে এবং সেসব মতবাদের পেছনে যদি শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছাত্রছাত্রীরা যাতে সেসব মতবাদ জানার সুযোগ পায় সেটা নিশ্চিত করা। স্কুলের মূল কাজ ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করতে শেখানো, নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করে তোলা। কোন বিষয়ে তোঁতা পাখির মত মুখস্ত করিয়ে মাছি মারা কেরানি বানানো যায়, সুশিক্ষিত নাগরিক তৈরি করা যায় না।
মানুষের সামনে যত বেশি বিকল্প পথ তত বেশি তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা। যার উপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক সভ্যতা সেই কোয়ান্টাম তত্ত্ব বহু সম্ভাবনায় বিশ্বাসী। জ্ঞান – এটা নিজেকে বিকাশ করার সুযোগ। প্রতিটি মানুষের বিকাশের উপর নির্ভর করে সমাজ তথা দেশের বিকাশ। পাঠ্যসুচী থেকে বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে আমরা জ্ঞানার্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করব, জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রগতিতে বাধা দেব। যে মানুষ মুক্ত ভাবে চিন্তা করতে পারে না সে না ধার্মিক, না বৈজ্ঞানিক - সে শুধুই অন্ধবিশ্বাসী!
বিঃদ্রঃ লেখাটি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.ajkerpatrika.com/259636/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6
বিবর্তনবাদের যারা বিরোধিতা করেন তাদের যুক্তি, কস্মিন কালেও তো কেউ কোন বানর থেকে তারা মানুষ হতে দেখেনি, তাহলে এটা সত্য হয় কি করে? কিন্তু তারা প্রশ্ন করে না যে ঈশ্বর যে প্রথম মানব তৈরি করেছেন সেটাও কেউই দেখেনি। তারা যদি সাক্ষ্য প্রমাণ বিহীন অনেক ঘটনায় বিশ্বাস করতে পারে তাহলে বিবর্তন তত্ত্বে এত আপত্তি কেন? এটাও তো একটা সম্ভাবনা মাত্র। তাছাড়া বিবর্তনবাদ বানর থেকে মানুষের উৎপত্তির কথা বলে না, সে বলে এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্যান্য প্রাণী তথা মানুষের উৎপত্তির কথা। আমরা নিজেরাই অনবরত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দুই প্রজন্মের আগের শিশু আর আজকের শিশু এক নয়, এক নয় সমাজ, সামাজিক বন্ধন। আমরা যদি সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন মেনে নিতে পারি – বায়োলজির ক্ষেত্রে সমস্যা কেন?
ধর্ম অতীত কেন্দ্রিক, সে অতীতে সব সমস্যার সমাধান দেখে। বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, সে শেষ কথা বলে না, একটু একটু করে সত্যের দিকে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞান জানে প্রতিটি নতুন জ্ঞান অনেক অজানার জন্ম দেয়। তাই তার যাত্রা অন্তহীন – সে শেষ কথা বলবে না, শেষ উত্তর দেবে না, আরও সঠিক, আরও নিখুঁত উত্তর পাবার জন্য এগিয়ে যাবে। তাই স্কুলে বৈজ্ঞানিক মতবাদ পড়ানোর সাথে সাথে ধর্মীয় মতবাদ পড়ালে বিজ্ঞানের অসুবিধা হয় না, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ধর্মীয় ব্যাখ্যা পড়তে সমস্যা হয় না, উল্টো সে তাতে সমৃদ্ধ হয়। কেননা বিজ্ঞানীর জন্য ভুল রেজাল্টও রেজাল্ট, এটা তাকে ভবিষ্যতে ভুল করার হাত থেকে রক্ষা করবে। ধার্মিকের সেই মহানুভবতা নেই, তার জন্য নিজের সত্যে আস্থা না রাখা আর ধর্মচ্যুত হওয়া সমার্থক। আর এ জন্যেই তার কাছে এটা অস্তিত্বের লড়াই। ধর্ম এখানে মহানুভব নয়।
বাহান্নতে আমরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি করেছিলাম, একমাত্র নয়। তাই আমরা মেহেদি হাসান বা গোলাম আলীর গজল শুনে নিজেদের ঋদ্ধ করতে পারি। যদি কেউ বাংলা বলে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল পড়া থেকে বিরত থাকে সেটা তার দীনতা। গণতন্ত্রের মূল কথা হল বিকল্প। বিকল্প না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না। আমরা পাঠ্যসুচী থেকে বিবর্তনবাদ তুলে দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করছি, মানুষের সার্বিক বিকাশে বাধা দিচ্ছি। মানুষের উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছে সে বিষয়ে রায় দেবার এখতিয়ার রাষ্ট্রের নেই। এ নিয়ে যদি একাধিক মতবাদ থাকে এবং সেসব মতবাদের পেছনে যদি শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছাত্রছাত্রীরা যাতে সেসব মতবাদ জানার সুযোগ পায় সেটা নিশ্চিত করা। স্কুলের মূল কাজ ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করতে শেখানো, নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করে তোলা। কোন বিষয়ে তোঁতা পাখির মত মুখস্ত করিয়ে মাছি মারা কেরানি বানানো যায়, সুশিক্ষিত নাগরিক তৈরি করা যায় না।
মানুষের সামনে যত বেশি বিকল্প পথ তত বেশি তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা। যার উপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক সভ্যতা সেই কোয়ান্টাম তত্ত্ব বহু সম্ভাবনায় বিশ্বাসী। জ্ঞান – এটা নিজেকে বিকাশ করার সুযোগ। প্রতিটি মানুষের বিকাশের উপর নির্ভর করে সমাজ তথা দেশের বিকাশ। পাঠ্যসুচী থেকে বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে আমরা জ্ঞানার্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করব, জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রগতিতে বাধা দেব। যে মানুষ মুক্ত ভাবে চিন্তা করতে পারে না সে না ধার্মিক, না বৈজ্ঞানিক - সে শুধুই অন্ধবিশ্বাসী!
বিঃদ্রঃ লেখাটি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.ajkerpatrika.com/259636/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6
Subscribe to:
Comments (Atom)
সিনিয়র সিটিজেন
কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...
-
কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...
-
সোভিয়েত ইউনিয়নে আসার আগে পর্যন্ত আমার একটাই ঠিকানা ছিল পোঃ + গ্রাম – তরা মানিকগঞ্জ, বাংলাদেশ। আমি মস্কো আসি ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর।...
-
পদার্থবিদ্যা ও গণিতের বাইরে যে বিষয়টি আমার খুব প্রিয় সেটা ইতিহাস। সেটা শুধু রাজা বাদশাহদের ইতিহাস নয়, মানুষের ইতিহাস, বিভিন্ন জায়গায় মানুষে...


