Thursday, March 2, 2023

বিবর্তন বাদ

স্কুলের পাঠ্যসূচী থেকে বিবর্তনবাদ বাদ দেওয়ায় সামাজিক মাধ্যম উত্তাল। বিবর্তনবাদ বিরোধীরা যেমন উল্লাসে ফেটে পড়েছে, বিবর্তনবাদের পক্ষের লোকজন তেমনি ফেটে পড়েছে ক্ষোভে। এই আনন্দ ও বেদনাকে উপেক্ষা করে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশ। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হলে তার মাশুল দিতে হয় দেশকেই।

বিবর্তনবাদের যারা বিরোধিতা করেন তাদের যুক্তি, কস্মিন কালেও তো কেউ কোন বানর থেকে তারা মানুষ হতে দেখেনি, তাহলে এটা সত্য হয় কি করে? কিন্তু তারা প্রশ্ন করে না যে ঈশ্বর যে প্রথম মানব তৈরি করেছেন সেটাও কেউই দেখেনি। তারা যদি সাক্ষ্য প্রমাণ বিহীন অনেক ঘটনায় বিশ্বাস করতে পারে তাহলে বিবর্তন তত্ত্বে এত আপত্তি কেন? এটাও তো একটা সম্ভাবনা মাত্র। তাছাড়া বিবর্তনবাদ বানর থেকে মানুষের উৎপত্তির কথা বলে না, সে বলে এককোষী প্রাণী থেকে বিবর্তনের বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্যান্য প্রাণী তথা মানুষের উৎপত্তির কথা। আমরা নিজেরাই অনবরত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দুই প্রজন্মের আগের শিশু আর আজকের শিশু এক নয়, এক নয় সমাজ, সামাজিক বন্ধন। আমরা যদি সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন মেনে নিতে পারি – বায়োলজির ক্ষেত্রে সমস্যা কেন?

ধর্ম অতীত কেন্দ্রিক, সে অতীতে সব সমস্যার সমাধান দেখে। বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, সে শেষ কথা বলে না, একটু একটু করে সত্যের দিকে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞান জানে প্রতিটি নতুন জ্ঞান অনেক অজানার জন্ম দেয়। তাই তার যাত্রা অন্তহীন – সে শেষ কথা বলবে না, শেষ উত্তর দেবে না, আরও সঠিক, আরও নিখুঁত উত্তর পাবার জন্য এগিয়ে যাবে। তাই স্কুলে বৈজ্ঞানিক মতবাদ পড়ানোর সাথে সাথে ধর্মীয় মতবাদ পড়ালে বিজ্ঞানের অসুবিধা হয় না, একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ধর্মীয় ব্যাখ্যা পড়তে সমস্যা হয় না, উল্টো সে তাতে সমৃদ্ধ হয়। কেননা বিজ্ঞানীর জন্য ভুল রেজাল্টও রেজাল্ট, এটা তাকে ভবিষ্যতে ভুল করার হাত থেকে রক্ষা করবে। ধার্মিকের সেই মহানুভবতা নেই, তার জন্য নিজের সত্যে আস্থা না রাখা আর ধর্মচ্যুত হওয়া সমার্থক। আর এ জন্যেই তার কাছে এটা অস্তিত্বের লড়াই। ধর্ম এখানে মহানুভব নয়।

বাহান্নতে আমরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি করেছিলাম, একমাত্র নয়। তাই আমরা মেহেদি হাসান বা গোলাম আলীর গজল শুনে নিজেদের ঋদ্ধ করতে পারি। যদি কেউ বাংলা বলে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল পড়া থেকে বিরত থাকে সেটা তার দীনতা। গণতন্ত্রের মূল কথা হল বিকল্প। বিকল্প না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না। আমরা পাঠ্যসুচী থেকে বিবর্তনবাদ তুলে দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করছি, মানুষের সার্বিক বিকাশে বাধা দিচ্ছি। মানুষের উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছে সে বিষয়ে রায় দেবার এখতিয়ার রাষ্ট্রের নেই। এ নিয়ে যদি একাধিক মতবাদ থাকে এবং সেসব মতবাদের পেছনে যদি শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছাত্রছাত্রীরা যাতে সেসব মতবাদ জানার সুযোগ পায় সেটা নিশ্চিত করা। স্কুলের মূল কাজ ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করতে শেখানো, নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করে তোলা। কোন বিষয়ে তোঁতা পাখির মত মুখস্ত করিয়ে মাছি মারা কেরানি বানানো যায়, সুশিক্ষিত নাগরিক তৈরি করা যায় না।

মানুষের সামনে যত বেশি বিকল্প পথ তত বেশি তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা। যার উপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক সভ্যতা সেই কোয়ান্টাম তত্ত্ব বহু সম্ভাবনায় বিশ্বাসী। জ্ঞান – এটা নিজেকে বিকাশ করার সুযোগ। প্রতিটি মানুষের বিকাশের উপর নির্ভর করে সমাজ তথা দেশের বিকাশ। পাঠ্যসুচী থেকে বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে আমরা জ্ঞানার্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করব, জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রগতিতে বাধা দেব। যে মানুষ মুক্ত ভাবে চিন্তা করতে পারে না সে না ধার্মিক, না বৈজ্ঞানিক - সে শুধুই অন্ধবিশ্বাসী!

বিঃদ্রঃ লেখাটি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে

https://www.ajkerpatrika.com/259636/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6

No comments:

Post a Comment

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...