Thursday, March 16, 2023

মিথ্যার বোমা

ইউক্রেনের সাথে রাশিয়াকে যুদ্ধে নামানোর আমেরিকান প্ররোচনার অনেকগুলো কারণের একটি ছিল নর্থ স্ট্রীম -২। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে জার্মানি আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে গ্যাস সরবরাহের চুক্তি হলে আমেরিকা এর বিপক্ষে ছিল কেননা সোভিয়েত ইউনিয়নের সস্তা গ্যাস জার্মানির শিল্প বিকাশে ও আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার পথ খুলে দেয়। ফলে যখনই রাশিয়া ও জার্মানির সাথে কোন রকম অর্থনৈতিক, বিশের করে তেল ও গ্যাসের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে তখনই বিভিন্ন ভাবে সেটা বন্ধ করার চেষ্টা করেছে আমেরিকা। নর্থ স্ট্রীম – ১ ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু তখন জার্মানির শাসকেরা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছেন আর তার ফলে সে সময় পাইপ লাইন তৈরি হয়েছে বাল্টিক সাগরের নীচ দিয়ে। ইউক্রেন আর বেলারুশ সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ বিধায় সে সময় পাইপ লাইনগুলো এসব দেশের উপর দিয়েই তৈরি করা হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কী ইউক্রেন, কী বেলারুশ সুযোগ পেলেই ট্র্যানজিট নিয়ে ঝামেলা করত, এমনকি, বিশেষ করে ইউক্রেন, ইউরোপের অন্য সব দেশের জন্য সরবরাহকৃত গ্যাস চুরি করত।

শিল্পের বিকাশের ফলে ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি আরও বেশি বেশি গ্যাস কিনতে শুরু করে আর এ জন্যে আর ট্র্যানজিটের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাবোটেজ মিনিমাইজ করতে বাল্টিক ও ব্ল্যাক সীর নীচ দিয়ে যথাক্রমে নর্থ ও সাউথ স্ট্রীমের প্রকল্প গ্রহণ করে রাশিয়া। অন্য দিকে শেল গ্যাসের উৎপাদন বাড়লে আমেরিকাও ইউরোপের বাজারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এক সময় বুলগেরিয়ার মাধ্যমে সাউথ স্ট্রীমের কাজ স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু জার্মানি নিজের স্বার্থে নর্থ স্ট্রীম কিছুতেই বন্ধ করতে রাজি হয় না। ফলে দরকার ছিল এমন কিছু করা যাতে এই প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে যায়। তাই রাশিয়াকে যুদ্ধে নামানো হয়। এছাড়া বাইডেন হুমকি পর্যন্ত দেন যে নর্থ স্ট্রীম – ২ কিছুতেই চালু হতে দেবেন না।

২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নর্থ স্ট্রীমে সন্ত্রাসী হামলা হয়। এর অর্থনৈতিক ও ইকোলজিক্যাল ক্ষতি অপরিসীম। এর ফলে ঐ এলাকার সামুদ্রিক প্রাণীর অর্ধেক ধ্বংস হয়েছে। পরিবেশের উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তবে এ নিয়ে পরিবেশবাদীদের মাথা ব্যথা নেই। কারণ ওয়াশিংটন থেকে অর্ডার আসেনি। প্রবলতার দিক থেকে এটা টুইন টাওয়ারের বিস্ফোরণকে ছাড়িয়ে গেছে।

ঘটনার পর পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উপর দায়িত্ব চাপানোর চেষ্টা করেছে। ইউরোপকে গ্যাস থেকে বঞ্চিত করতে রাশিয়া নিজেদের পাইপ লাইন নিজেরাই ধ্বংস করেছে। তবে যুক্তিবাদী মানুষ সেটা প্রত্যাখান করেছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ হবার ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে আমেরিকা। রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার পাশাপাশি জ্বালানি যোগ হওয়ায় আমেরিকার উপর ইউরোপের নির্ভরতা আরও বেড়েছে। ফলে এই হামলার পেছনে আমেরিকার স্বার্থ ও হাত দুটোই জড়িত - এমন ভাষ্য আগেই ছিল।

কিছুদিন আগে পুলিৎসার বিজয়ী সাংবাদিক সেইমুর হেরস দাবি করেছেন যে বাইডেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সার্কেল এই সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত। তিনি তথ্য প্রমাণসহ এই অভিযোগ তুলেছেন, যদিও কে তাঁকে এই খবর দিয়েছে সেটা প্রকাশ করেননি। আমেরিকা সেটা স্বাভাবিক কারণেই অস্বীকার করেছে। কিন্তু দু'দিন আগে তারা ইউক্রেনকে দোষী করেছে। বলেছে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী এক বা একাধিক গ্রুপ এর সাথে জড়িত। তবে তাদের সাথে জেলেনস্কির সম্পর্ক নেই। বাইডেন নিজেও এই সমর্থনকারীদের একজন। আজ আমেরিকা জানালো অনেক আগেই তাদের কাছে এসব তথ্য ছিল, তারা এমনকি হামলার আগে জার্মানিকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল। এসব থেকে একটা সত্যই বেরিয়ে আসে – অনেক কিছুর মতই মিথ্যে বলাতেও আমেরিকা আজকাল খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না, মিথ্যেটাও দুই নম্বরী হয়ে যাচ্ছে। একেই বলে পতন।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ১৬ মার্চ ২০২৩ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে

https://www.ajkerpatrika.com/263630/%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%AE%E0%A6%BE

No comments:

Post a Comment

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...