Tuesday, January 24, 2023

মৃত্যুহীন জীবন

১৯৭২ সাল। স্বাধীনতার পরে ইন্ডিয়া গেলাম। অনেকদিন ছিলাম বহরমপুর মাসি বাড়ি। এটা দামোদরের (যদিও গঙ্গা বলেই ডাকে) উল্টোদিকে, গোয়ালজান গ্রামে। বাড়ির সাথেই স্কুল। তাই শুরু করলাম স্কুলে যাওয়া। ১৯৬৯ সালে যখন প্রথম ইন্ডিয়া যাই, তখনও ওই স্কুলে কিছুদিন গেছিলাম। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ক্লাস ছিল না, তাই মনে হয় স্কুলের প্রতি বেশ টান ছিল। ঘুম থেকে উঠেই চলে যেতাম স্কুলে। বাংলা বইয়ে বিভিন্ন গল্প ছিল। এখনও মনে আছে নেতজি সুভাষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন। যদি ভুল না করি অবাক জলপান সেখানেই ছিল। আর ছিল গ্রীক গায়কের গল্প। মা ছিলেন নেতাজীর ভক্ত। মার মুখে নেতাজির কথা শুনতে শুনতে কবে যে নিজেই তাঁর অনুরাগী হয়ে যাই। এরপর ছিল তাঁকে নিয়ে অনেক গল্প, অনেক পড়া। এক ধরণের অলৌকিক আওরা ছিল তাঁকে ঘিরে। পরে শানেওয়াজ খানের “আজাদ হিন্দ ফৌজ” তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়। প্রায়ই তপন দার আলমারি থেকে ওই বইটা নিয়ে পড়তাম। অনেক পরে যখন সিঙ্গাপুর যাই মনে মনে খুঁজে বেড়াই তাঁকে। “আমি সুভাষ বলছি” বার্লিন থেকে নেতাজির বেতার ভাষণ সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের মতই আমাকে নাড়া দিত।

১৯৮৩ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশুনা করতে আসি আর সোভিয়েত জনগণের উপর হিটলারের বাহিনীর অত্যাচারের কথা শুধু বইয়ে পড়ে নয় সারা সোভিয়েত দেশে ছড়িয়ে থাকা সেই বর্বরতার চিহ্ন দেখি, নেতাজি হিটলারের সাহায্যে ভারত স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন বলে কষ্ট পেয়েছি। সে সময়ে নেতাজির প্রতি আবেগে অনেকটাই ভাটা পড়ে। পরে তাঁর “An Indian Pilgrim”, “The Indian Struggle”, রুদ্রাংশু মুখার্জির “Nehru and Bose: Parallel lives” এসব বই পড়ে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়। নতুন করে নেতাজিকে ভালবাসতে শিখি। নেতাজি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অনুসারী। একসময় সি আর দাশ আর মতিলাল নেহেরু খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁরা স্বরাজ পার্টি গড়ে তুলেন। এ সত্ত্বেও জওহরলাল নেহেরুর সাথে নেতাজির কখনই তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না। শুধু তাই নয় গান্ধী, মৌলানা আজাদ, বল্লভ ভাই প্যাটেল - এদের সঙ্গে সুভাষ বসুর সম্পর্ক ভাল ছিল না, যদিও নেতাজি প্যাটেলের বড় ভাইয়ের বিশ্বাসভাজন ছিলেন। কংগ্রেসের ভেতর তাঁরা দুই ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি ছিলেন। এ সবই শুধু কংগ্রেসের ভেতরের নয়, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে যে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী স্রোত ছিল সেটাই প্রমাণ করে। আর এই দলাদলিই শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সমস্যা সামনে নিয়ে আসে যার ফলে আমরা পাই বিভক্ত ভারত। তাই নেহেরুর “An autobiography” বা গান্ধীর আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ “An experiment with the truth” বা মৌলানা আজাদের “India wins freedom” বইয়ে নেতাজির তেমন উল্লেখ না দেখে অবাক হইনি। আসলে বাংলার বাইরের লেখকেরা কখনই নেতাজিকে নিয়ে তেমন কিছু লিখেছেন বলে মনে হয় না, তারা অতি যত্নে তাঁর প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। হতে পারে আমি নিজে হয়তো সেসব লেখার সাথে পরিচিত নই। কিন্তু সুনীল গাঙ্গুলির “প্রথম আলো”য় যেখানে সমসাময়িক ছোট বড় সবাই অল্পবিস্তর পরিসরে সামনে এসেছেন সেখানে নেতাজির পরিপূর্ণ অনুপস্থিতি ছিল অবাক করার মত। যে সময় ও যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ বই লেখা হয়েছে সেখানে নেতাজি মিসিং এলিমেন্ট হয়েই থেকে গেছেন। অবশ্য প্রথম আলো ইতিহাস হয়, ঐতিহাসিক পটভূমিতে লেখা উপন্যাস। সেখানে কাকে রাখবেন আর কাকে রাখবেন না সেটা লেখকের ব্যাপার। তবে যারা সেই সময়ের বাংলা বা ভারতের ইতিহাসের সাথে পরিচিত তাদের মনে এই প্রশ্নটা আসতেই পারে।

মানুষ মাত্রই ভুল করে, তবে কিছু ভুল ইচ্ছাকৃত, ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের হিসেব নিকেশ থেকে, কিছু ভুল মানুষ করে পথ খুঁজতে গিয়ে। জানি না, কী হতে পারত নেতাজি বেঁচে থাকলে, তবে এ নিয়ে ভাবতে মানা নেই। যদি আমেরিকার দিকে তাকাই কী দেখি? লড়াই করে অর্জিত স্বাধীনতা তাদের সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন করেছে, তাদের পৃথিবীর অন্যতম সফল জাতিতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আমার সেটাই মনে হয়। একাত্তরে দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের ফলে আমাদের দেশেও এক ধরণের দেখিয়ে দেওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠেছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া সন্তান যেমন সব সময় অন্যদের দেখিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে আমরাও কিন্তু সব সময় চেষ্টা করি সব ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যেতে। ভারতকেও। ভারত আর পাকিস্তান লড়াই করে আজাদী অর্জন করেনি, করেছে ইংরেজের কাছে আবেদন নিবেদনের মধ্য দিয়ে। তাই এরা কখনও ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যাবার কথা ভাবেনি, বরং তাকে অনুসরণ করেছে। নেতাজি ভিন্ন পথে গিয়েছিলেন। তিনি অনুগ্রহ নয়, লড়াই করে ভারত স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। সেটা হলে হয়তো দেশ ভাগ হত না, হলেও দেশেও মানুষ হত ভিন্ন রকমের, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এটাই হয়তো ভারতকে আলাদা করত, ভারতকে অন্য পথে নিয়ে যেত। সব চেয়ে বড় কথা তিনি ক্ষমতার জন্য নিজের স্বপ্নের সাথে কম্প্রোমাইজ করেননি। আজীবন যে স্বপ্ন দেখেছেন সেটা অর্জনের জন্য নিষ্ঠার সাথে লড়াই করে গেছেন। নিজেকে বিশ্বাস করা, নিজের স্বপ্নকে বিশ্বাস করা - কজন সেটা পারে। আজ তাঁর জন্মদিন। মৃত্যু নিয়ে রহস্য তাঁকে মৃত্যুহীন করেছেন। নেতাজি মৃত্যুহীন। শুভ জন্মদিন। বার বার আমরা যেন শুধু জন্মদিনেই নয় অন্য সময়েও তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর দেখানো পথ থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজ ও দেশ গড়তে মনযোগী হই আর তিনি যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এসবের ঊর্ধ্বে উঠে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তুলেছিলেন দেশকে যেন সেভাবেই গড়ে তুলতে উদ্যোগী হই।

দুবনা, ২৩ জানুয়ারি ২০২৩

No comments:

Post a Comment

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...