আমাদের দেশে জামাই আর শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে ভাল
ভাল গল্প চালু আছে। যেমন জামাই ষষ্ঠী, জামাই আদর – এ সবই জামাইয়ের প্রতি শাশুড়ির দরদের
কথাই প্রকাশ করে। সেটা হয়তো এ কারণে যে আমাদের দেশে বিয়ের পর মেয়ে বাবার বাড়ি ছেড়ে
শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। সেটাই হয় তার নতুন ঘর, নতুন বাড়ি। এখানেই গড়ে ওঠে তার নতুন জীবন।
বাপের বাড়ি সে আসে কালেভদ্রে। আর যেহেতু স্বামীর বাড়িই তার জন্য সব তাই সেই বাড়িতে
মেয়ে যাতে আদর যত্ন পায় সেকারণেই হয়তো শাশুড়ি জামাইকে বেশি আদর করেন। তবে রাশিয়ার কথা
একেবারেই আলাদা। এখানে তেমন কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই কে কোথায় থাকবে – স্ত্রী স্বামীর
বাড়ি নাকি উল্টোটা। সোভিয়েত আমলে এ দেশে বেশ জটিল এক সিস্টেম ছিল – যার কারণে প্রতিটি
মানুষ কোন না কোন এলাকায় বলা যায় গৃহবন্দী থাকত। না, ঠিক জেল নয়, তবে কাছাকাছি। সে
সময় সব কিছুই হত সরকারি খরচে – লেখাপড়া থেকে শুরু করে সব। সরকার নিজের ঠিক করত কোথায়
কতজন বিশেষজ্ঞ দরকার, সেভাবেই তারা তৈরি হত আর সেই অনুযায়ী পাশ করার পর ছেলেমেয়েদের
বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হত। সেখানে গেলে তারা কাজ পেত, পেত থাকার জায়গা ইত্যাদি। অর্থাৎ
প্রতিটি মানুষের ছিল নির্দিষ্ট জায়গায় একটা স্থায়ী ঠিকানা। আর শুধু এই অফিসিয়াল স্থায়ী
ঠিকানা থাকলেই সেই এলাকায় সে কাজ পেত, পেত চিকিৎসা, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা।
এক কথায় জীবন যাপন করতে যা কিছু লাগে সব। কিন্তু অন্য কোথাও গেলে তার না থাকত কাজ,
না থাকত বাসস্থান। হ্যাঁ, হোটেলে থাকা যেত, তবে সেটা সাময়িক। হোটেলের ঠিকানা দেখিয়ে
কোথাও কাজ পাওয়া যেত না। তাই বললাম – সে ছিল গৃহবন্দী। এই স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া যেত
সরকার থেকে, মানে সরকার নিজে থেকে যখন কাউকে কোথাও কাজ দিত, তখন সে থাকার ব্যবস্থাও
করত। আর একটা উপায় ছিল – বিয়ে করা। অর্থাৎ কেউ বিয়ে করলে স্বামী বা স্ত্রীর ওখানে আইনত
স্থায়ী ঠিকানা পেত আর সেক্ষেত্রে তাকে আগের ঠিকানা বা সেখানকার স্থাবর সম্পত্তির উপর
অধিকার ত্যাগ করতে হত। অধিকার মানে যেহেতু সবই ছিল সরকারি সম্পত্তি, তাই চাইলেই বাবা
মার পরে সে সেখানে ফিরে যেতে পারত না, এসব সরকারের হাতে ফেরত যেত। তবে বাবা মা চাইলে
তাদের বাসা ছেলে বা নাতি নাতনীদের নামে লিখে দিতে পারত। কিন্তু কথা একটাই, কারও একটার
বেশি বাসা থাকতে পারবে না। সে কারণেই অনেকেই, বিশেষ করে যারা গ্রাম বা ছোট শহর থেকে
বড় শহরে আসত পড়াশুনা করতে, চেষ্টা করত এ সব শহরের ছেলেমেয়েদের সাথে প্রেম করে পরবর্তীতে
বিয়ে করতে। আর একবার সেটা হয়ে গেলে সেখানে কাজের অভাব হত না। এটাকে ব্যবহার করে অনেকে
যেমন কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করত, অনেকে আবার শুধু বড় শহরে থাকার জন্যই বিয়ে করত প্রেমের
ভান করে। সেসব বিয়ে না টিকলে পরে ছাড়াছাড়ি আর সম্পত্তির ভাগ – মানে আগের বাড়ি বদলিয়ে
তাদের আলাদা আলাদা কোথাও থাকার ব্যবস্থা করা হত। এক্ষেত্রে যে স্থানীয় সে ক্ষতিগ্রস্থ
হত, কেননা তার বাসায় ভাগ করে অপর পক্ষকে দেওয়া হত। আর যেহেতু এতে শ্বশুর বা শাশুড়ি
(কেননা বাসাটা তো তাদেরই ছিল) ক্ষতিগ্রস্থ হতেন – তাই এখানে বিশেষ করে জামাই ও শাশুড়ির
সম্পর্ক ছিল সাপে নেউলে। অন্তত সেটাই বলা হয়ে থাকে আর সে নিয়ে এদেশে হাস্যরসের শেষ
নেই।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে শাশুড়ির ওখানে থাকিনি, কেন
না আমাদের যখন পরিচয় হয় তখন আমার হবু স্ত্রী আলাদা বাসায় থাকত। তবে মস্কো থাকাকালীন
তিনি প্রায় প্রতিদিন আমাদের বাসায় আসতেন বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে। সে সময় তিনি পেনশনে
ছিলেন আর এদেশের দাদা-দাদীদের কাজই নাতি নাতনির দেখাশনা করা। তাছাড়া আমি যেহেতু দুবনায়
থাকতাম, তাই আমার সাথে দেখা হত কম। পরে আমরা সবাই মিলে দুবনায় চলে গেলে তিনি মাঝেমধ্যে
আমাদের সাথে এসে থাকতেন। তাতে ছেলেমেয়েরাও যেমন খুশি হত, আমরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম।
শত হলেও আমাদের সংসার ছিল বড়। একা আমার স্ত্রীর পক্ষে সব দিক সামাল দেওয়া সম্ভব হত
না। তবে উনি প্রায়ই হাসপাতালে থাকতেন। স্ত্রীর ভাষায় এটাই ছিল তার অসুখ – কাড়ি কাড়ি
ট্যাবলেট খাওয়া আর হাসপাতালে গিয়ে থাকা। আর এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রায়ই কথা কাটাকাটি
হত। আমি ছিলাম নীরব দর্শক।
একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি মহা হইচই। শাশুড়ি
নাকের জলে চোখের জলে সব একাকার করে ফেলেছে আর আমার স্ত্রীকে অনুরোধ করছে ডাক্তার ডাকতে।
আমি একটু বিরক্ত হয়েই জানতে চাইলাম
কী হল তোমাদের?
বাবুশকা (দিদিমা) বলছে সে নাকি তার দাঁতের প্রটেজ গিলে ফেলেছে। - মনিকা জানাল।
তা মাকে বল দেখতে।
মা বলছে দেখতে পারবে না। আর বাবুশকা ভয়ে কাঁদছে।
মহা মুস্কিল। আমি গুলিয়াকে বললাম এটা একটা সুরাহা করতে।
তোমার দরকার হয় তুমি কর। আমি এসব নাটকে অংশ নিতে পারব না।
অন্তত কান্নাকাটি যাতে না করে সে ব্যবস্থা কর।
আমি কী করব?
ঐ সময় আমাদের বাসায় টেলিফোন ছিল না। তখন মোবাইলের যুগ সবে শুরু। ওসব আমাদের ধরাছোঁয়ার
বাইরে। খুব জরুরি কাজ থাকলে আমাদের ফ্ল্যাটের উপরে যারা থাকতেন তাদের ওখানে গিয়ে ফোন
করতাম।
ঠিক আছে, তুমি আমাকে বল কী হয়েছে। আমি দেখি ডাক্তারকে ফোন করে অন্তত জানার চেষ্টা করি
কি করতে হবে।
কিছুক্ষণ আগে মা হইচই শুরু করল যে জল খেতে গিয়ে ভুলে প্রটেজ গিলে ফেলেছে। সেই তখন থেকে
কান্নাকাটি। ডাক্তার ডাকতে বলছে। কিন্তু আমি ডাক্তারকে কী বলব? যদি মনে কর, যাও, ফোন
করে জান কী করতে হবে।
আমি সব খবর জেনে গেলাম উপরের ফ্ল্যাটে। আসলে ব্যাপারটা এতই ডেলিকেট যে অন্যদের সামনে
এ ব্যাপারে ফোন করাটাও হাস্যকর। কিন্তু উপায় নেই। অকাহ্নে তখন থাকত চার জেনারেশনের
এক সম্পূর্ণ মহিলা পরিবার। অনেক বয়স্ক দিদিমা, তার মেয়ে সভেতা (আমাদের চেয়ে একটু বড়),
সেভতার মেয়ে আর নাতনি ইউলিয়া। ইউলিয়া ছিল মনিকার সমবয়সী, প্রায়ই একসাথে খেলাধুলা করত।
ইউলিয়া বেড়াতে আসত আমাদের বাসায়, মনিকা যেত ওর ওখানে। যাহোক, গেলাম ওদের ওখানে। ইতিমধ্যে
সন্ধ্যা নেমেছে। ফোন করতে হবে ইমারজেন্সিতে।
কলিং বেল টিপতেই সভেতা দরজা খুলল।
প্রিভিয়েত সভেতা।
প্রিভিয়েত। কেমন আছ?
ভাল। তোমরা ভাল?
চলে যাচ্ছে। তোমার কি ফোন করা দরকার?
ওরা জানে ফোন করার দরকার হলেই সাধারণত আমরা বড়রা
কেউ আসি।
হ্যাঁ, যদি কিছু মনে না কর।
অবশ্যই।
বাসার অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করে ও ঘরে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত ফোন করলাম ইমারজেন্সিতে।
০৩ কল করতেই ওদিক থেকে মহিলার সুরেলা কণ্ঠ
শুভ অপরাহ্ন, আপনাকে শুনছি।
শুভ অপরাহ্ন। আমার বাসায় বাবুশকা মনে হয় জল খেতে গিয়ে প্রটেজ গিলে ফেলেছেন। খুবই নার্ভাস
দেখাচ্ছে তাকে। কান্নাকাটি করছেন। কী করতে পারি এখন?
বয়স কেমন?
ষাটোর্ধ।
তাকে প্রথমে শান্ত হতে বলেন। আর এমতাবস্থায় তেমন কিছু করার নেই। বলেন প্রাকৃতিক পথেই
প্রটেজ বেরিয়ে যাবে। ভয়ের কোন কারণ নেই।
আমি বাসায় ফিরে সেটা জানাতে শুরু হল হাঁসির জোয়ার। নাতি নাতনিরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে
বলতে লাগলো
বাবুশকা, ভয়ের কিছু নেই। তুমি বাথরুম কর, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। গুলিয়াও ওদের সাথে
যোগ দিল। এসব দেখে বাবুশকার অবস্থা আরও খারাপ।
আমি এগিয়ে এলাম তার সাহায্যে
এই যে আপনি বলছেন প্রটেজ গিলে ফেলেছেন। কিন্তু
সেটার তো গলায় আটকে যাওয়ার কথা। আপনি কিছু টের পাননি?
না, একেবারে টের পাইনি।
ভাল। তাহলে আপনি বুঝলেন কি করে যে ওটা ঠিক ঠিক গিলে ফেলেছেন?
আমার তাই মনে হচ্ছে।
তার মানে আপনি শিওর নন যে সেটা গিলেছেন কি গিলেন নাই – তাই তো?
হ্যাঁ।
তাহলে তো প্রথমেই দেখতে হবে প্রটেজ জায়গা মত আছে কিনা। এক কাজ করুন, বাথরুমে গিয়ে আয়নার
সামনে দাঁড়ান, দেখুন ওটা আছে কি নেই। আমি অপেক্ষা করছি।
আসলে প্রটেজ গিলে ফেলেছেন তাই লজ্জায় তিনি এতক্ষণ
আমাদের সাথে কথা বলছিলেন হাত দিয়ে মুখ ঢেকে। ফলে দাঁত জায়গা মত আছে কি নেই সেটা জানার
কায়দা ছিল না। তাই ওনাকে পাঠিয়ে দিলাম বাথরুমে আয়নার নিজের মুখ দেখতে। ছেলেমেয়েরাও
চলল তার পেছন পেছন।
কয়েক মিনিট পরে পাশের ঘরে ছেলেমেয়েদের অট্টহাসি। গুলিয়াও তাতে যোগ দিয়েছে।
কী হল আমার?
কিছুই না। বাবুশকার দাঁত পাওয়া গেছে।
কোথায়?
মুখের ভেতরে। এতক্ষণ সেখানেই ছিল। উনি এতক্ষণ ভয়ে মুখের ভেতর প্রটেজ আছে কিনা সেটা
চেক করতে ভুলে গেছিলেন।
যাক, বাঁচা গেল।
মনে মনে ভাবলাম, চিল শুধু কানই নেয় না, দাঁতও নেয়।
এরপর এই ঘটনা বাসায় গল্পের এক মুখরোচক উপাদান হিসেবে কাজ করে। বাবুশকা কিছু হারিয়েছে
বললেই সবাই তাকে সেই ঘটনা মনে করিয়ে দিত।
দুবনা, ১০ আগস্ট ২০২২
বিঃ দ্রঃ লেখাটি ১২ আগস্ট জ্বলদর্চি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.jaladarchi.com/2022/08/teeth-bijan-saha.html

No comments:
Post a Comment