Tuesday, August 23, 2022

স্বর্গের ভেতর নরক

 

আমি মস্কো আসি ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ থেকে গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে সে বছর আমরাই ছিলাম শেষ ব্যাচ। এয়ারপোর্টে বড় ভাইয়েরা নিতে এসেছিল। ওখান থেকে সোজা ৬ নম্বর ব্লকে। প্রস্তুতি পর্বের ছেলেরা তখন সেখানেই থাকত। যদিও রুমগুলো ছিল তিন জনের জন্য, থাকতাম আমরা চারজন করে। একজন সোভিয়েত আর তিন জন বিদেশী, সাধারণত বিভিন্ন দেশের ছেলেরা থাকত এক রুমে যাতে নিজেদের ভাষার পরিবর্তে রুশ ভাষার কম্যুনিকেট করার চেষ্টা করে। এটা যে কাজে দিত, সেটা নিজেদের দেখেই বুঝতে পারি।

৬ নম্বর ব্লকে আমি ছিলাম ৩৫৩ নম্বর ঘরে। আমার রুমমেট ছিল সোভিয়েত মালদাভিয়ার কিশিনেভের আন্দ্রেই, ছিল দিল্লীর অরুণ, নেপালের বদ্রী। আমিই ছিলাম সব শেষে আসা। অরুণ আর আন্দ্রেই পড়বে ফিললজীতে, বদ্রী সাংবাদিকতায়। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এলেও ফিজিক্সে চলে যাবো সেটা ছিল নিশ্চিত। বদ্রী এর আগে তাসখন্দে কমসমলের ট্রেনিং নিতে এসেছিল, রুশ ভাষা কিছুটা জানত, তাই কয়েকদিন পরেই প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে রুম ছেঁড়ে চলে যায়। আমরা কিছু দিন তিন জনেই ছিলাম, যদিও পরে আমাদের রুমে প্রদীপ নামে সুরিনামের এক ছেলে আসে।

এই রুমটা আমি কখনই ভালবাসতে পারিনি। আসার দুদিন পরেই যখন আন্দ্রেই একটা রুটিন তৈরি করে বলল কে কবে ঘর পরিষ্কার করবে, আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। এটা ছিল এক বিশাল মানসিক পরীক্ষা। তাছাড়া আমি এর আগে সারা জীবন বাড়িতে কাটিয়েছি। এমন কি বুয়েটে যখন পড়তাম, ক্লাস থেকে হলে ফেরার পথে মানিকগঞ্জগামী মিনিবাস দেখলে প্রায়ই উঠে পড়তাম, চলে যেতাম বাড়ি আর খুব ভোরে এসে ক্লাস করতাম বাড়ি থেকে। যদিও আমাদের ঘরটা ছিল বেশ ফিটফাট, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তবুও এই ঘরের উপর আমার ছিল যত রাগ, যেন এই ৩৫৩ নম্বর ঘরটাই আমাকে ধরে রেখেছে মস্কোয়, ফিরে যেতে দিচ্ছে না প্রিয় গ্রাম তরায়।

প্রস্তুতি পর্ব শেষ হতে না হতেই আমি চলে যাই পাভলভস্কায়ায়। তখন ফিজিক্স, ম্যাথেমাটিক্স আর রসায়নের ছেলেরা সেখানে থাকত, আর থাকত কৃষিবিদ্যার ছেলেরা। আমি অনেক দিন পরে বাংলাদেশ থেকে গেছি ফিজিক্সে পড়তে, তাই ওখানে সমবয়েসী বাংলাদেশী আর কেউ ছিল না। কয়েকজন ছিলেন কৃষিবিদ্যায়, তবে অনেক বড়। তাই ওখানে থাকলেও আমি প্রায়ই চলে আসতাম মিকলুখো মাকলায়ায় বন্ধুদের কাছে। ঐ জায়গাটা ভালো বা মন্দ লাগার আগেই আমাদের আবার ফিরিয়ে আনা হয় মিকলুখো মাকলায়ায় ২ নম্বর ব্লকে যেখানে ৫১০ নম্বর ঘরে আমি কাটাই ১৯৮৫ র ফেব্রুয়ারী থেকে ১৯৯৪ র মে পর্যন্ত। বছর দুই পরে, মানে ১৯৮৭ সালে যখন রুমা-সুস্মি প্লেখানভে থাকতে শুরু করে আর আমি হই ওদের নিত্য দিনের অনাহুত অতিথি, তখন মনে হত বেশ হত যদি আগের মতই পাভলভস্কায়ায় থাকতাম! সব চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার ঘরটার কথা মনে থাকলেও ঘরের নম্বরটা এখন মনে নেই। আমার ঘরের সামনেই ছিল টেবিল টেনিসের বোর্ড। আমি, রানা, পার্থ, সঞ্জয় প্রায়ই খেলতাম। এরমধ্যে রানা আর সঞ্জয় ছিল আমার রুমমেট। আসলে ফর্মালি আমার রুমমেট ছিল অন্য কারা যেন যাদের আমি কখনই দেখিনি তাই নিজের থেকেই রানা আর সঞ্জয়কে ডেকে এনেছিলাম যাতে এত বড় ঘরে একা না থাকতে হয়। আমাদের বন্ধু চঞ্চল খারকভ থেকে মস্কো এলে আমাদের সাথে থাকত। মাঝে মধ্যে টেবিল টেনিস খেলার বদলে  রানা, পার্থ আর বিশ্বরূপ গীটার বাজিয়ে গান করত

উহুমনা উহুমনা উহুমনা বলে ......

ওখানে থেকেই ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমিস্টারের পরীক্ষা দেই। পড়াশুনা ভালই করতাম, তাই আশা ছিল এক্সিলেন্ট রেজাল্ট হবে। মেকানিক্সের পরীক্ষা দিতে দিয়ে ভিস্কোসিটি শব্দটা ভুলে গেলাম, যদিও আকারে ইঙ্গিতে সব বুঝিয়েছিলাম। টিচার ৪ বসানোর সাথে সাথেই মনে পড়লো শব্দটা, কিন্তু উনি বললেন

- খুব দেরি হয়ে গেল।

বিকেলে কথায় কথায় বিশ্বরূপকে বললাম

- যাকগে, আমি তো সাবজেক্টটা জানি।

- জানিস যদি, তবে পাঁচ পেতে সমস্যা কোথায়?

এ কথাটা পরে অনেক কাজে লেগেছে।

২ নম্বর ব্লকে কাটে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু। ওটা ছিল নিজেকে গড়ার সময়, ভালোলাগার, ভালোবাসার সময়। আজকের আমি, এটা ২ নম্বর ব্লকের ৫১০ নম্বর রুমের উত্তরসূরি। যদিও আমার পরে এক এক করে বেশ কিছু ছাত্র আসে দেশ থেকে আমাদের ফ্যাকাল্টিতে, তবে অন্য সব ফ্যাকাল্টির তুলনায় তা ছিল নগন্য। এর অবশ্য একটা ভালো দিক ছিল। এর ফলে আমার চলাফেরা শুধু বাঙালী বা বাংলাদেশী আড্ডার মধ্যেই সীমিত ছিল না। ক্লাস শেষ লাইব্রেরীতে পড়াশুনা করে চলে যেতাম বাংলাদেশীদের সাথে আড্ডা দিতে। বাসায় ফিরে সেটা চলত রুশ বা অন্য দেশী বন্ধুদের সাথে। ঐ সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে ভালো চা বা কফি খুব একটা পাওয়া যেত না। আর আমার জন্য সব সময়ই ভালো ইন্ডিয়ান চা আর কফি পাঠাতো বাড়ি থেকে। ফলে আলেগ, আন্দ্রেই, ফিওদর, ইউরা ওরা সন্ধ্যায় আসত আমার রুমমেট ইয়েভগেনির কাছে। চা খেতাম একসাথে, গল্প হতো বিভিন্ন রকমের। পরে যখন পেরেস্ত্রইকায় কাঁধে ভর করে মুক্ত চিন্তা এদেশে আসে আমার ঘরে প্রায়ই ওরা আলাপ করত রাজনীতি নিয়ে। বিশেষ করে পরের দিকে যখন মস্কোভস্কি কলসোমলস্ক বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল আর্টিকেল লিখত আমরা উত্তেজিত ভাবে এসব আলোচনা করতাম। যদিও সে সময় ইয়েলৎসিন জনপ্রিয়তা লাভ করছিলেন ওদের মুখেই শুনতাম তিনি কিভাবে অফিসের এক স্টপেজ আগে গাড়ি থেকে নেমে ট্রামে করে আসতেন আর এটাকে ব্যবহার করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতেন। ওরা যে গরবাচেভের সমর্থক ছিল তা নয়। ওরা বিটলস পছন্দ করত, পিঙ্ক ফ্লয়েড শুনত, জিন্স পরত – এক কথায় পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্কে আগ্রহী ছিল, তবে কেউই যাকে বলে অন্ধ ভাবে না সোভিয়েত না পশ্চিমা কোন প্রোপ্যাগান্ডা বিশ্বাস করত না।

আমাদের ২ নম্বর ব্লকে নিয়ে আসে মেরামতের পরে, তাই ইচ্ছেমত রুমমেট বেঁছে নেয়া যেত। পড়াশুনায় ভালো করতাম বলে ফ্যাকাল্টিতে নাম ছিল, সুযোগ সুবিধাও ছিল। কিন্তু আমার কখনই মনে হয়নি রুমমেট বেঁছে নিতে হবে। আমার মত ইয়েভগেনিও পড়ুয়া ছেলে। তাই ও যখন বললো এক সাথে থাকার জন্য, কোন প্রশ্নই মনে জাগে নি। আমাদের সাথে আরও এল রজার বলে মেক্সিকোর এক ছেলে। প্রথম দিনই নিজের ভুল বুঝলাম যখন রজার আলমারিতে তালা ঝুলালো। রুমে ফিরত রাত করে, এসেই শব্দ করে তালা খুলত। কয়েক বছর পরে ও অন্য রুমে চলে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের মধ্য বন্ধুত্ব হয়নি। শুধু আমার সাথে নয়, কারো সাথেই ওর বন্ধুত্ব হয়নি। ও চলে গেলে আমাদের রুমে আসে তামিলনাড়ুর শ্রীকুমার। আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব থাকলেও কথা  হত কম। ও রুমে ফিরত গভীর রাতে যখন আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম, আর আমরা যখন ক্লাসে যেতাম ও ঘুমুত। তাই দেখা হতো মূলত রবিবার। আর আমরা যখন পরীক্ষা শেষ করে বেড়াতে যেতাম, ও শিক্ষকদের পেছন পেছন ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা দিত। তবে বাইরের পড়াশুনা করত প্রচুর। ছুটির সময়ে কুমার থাকলে আমি প্রায়ই ওকে নিয়ে সকালে দৌড়ুতে যেতাম। এক সময় গনেশ দা আমাদের দৌড়ে সংগ দিতেন। ওনার ওখানে আস্ত্রাখান থেকে প্রনত দা এলে তো কথাই নেই। তিনি ক্যাভিয়ার নিয়ে আসতেন আর আমি আর কুমার গনেশ দাকে সাহায্য করতাম যাতে এত কষ্ট করে আনা ক্যাভিয়ার নষ্ট না হয়ে যায়। কুমারের সাথে যেতাম চার্চের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে ইস্টারে ফ্রান্সের দূতাবাসের সামনের চার্চে। ওখানে বাবুশকারা (বৃদ্ধা মহিলা) আমাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতেন। কখনও কখনও গভীর রাতে আরবাত ষ্ট্রীটে যেতাম রক মিউজিক শুনতে। সেখানে ননফর্মাল ইয়ং ছেলেমেয়েরা গীটার বাজিয়ে গান গাইত।  সেখান থেকে পুলিশ আমাদের চলে যেতে বলত আর যারা গাইত ওদের ভাগিয়ে দিত। এটাই ছিল সোভিয়েত জীবনে আরও একটা বাস্তবতা। ২ নম্বরে থাকার আরেকটা সুবিধা হোল চাইলেই আমি একা হয়ে যেতে পারতাম যেটা কিনা যে সব হোস্টেলে প্রচুর বাংলাদেশী থাকত সেখানে ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে একা হতে চাইলে আমি কখনও পাশের বনে চলে যেতাম অথবা আরবাত। হ্যাঁ, আরবাতের জনারণ্যে। সেখানে কেউ তোমাকে চেনে না, তুমি কাউকে চেন না – অনেকের মাঝে, তবুও একান্তই আপনার, একান্তই একা। অবশ্য মাঝে মধ্যে আমার রুমেও বাংলাদেশীদের আড্ডা হত, বিশেষ করে মে’ ডে তে, যখন মস্কোর সব বাংলাদশী বন্ধুরা আসত আমার ওখানে। সবার কাছ থেকে ১ রুবল করে নিয়ে আমি রুটি মাংস কিনে আনতাম, সাথে থাকত পিভা মানে বিয়ার। এই রুমে থেকেই আমি আমার মাস্টার্স শেষ করেছি, পি এইচ ডিও এই রুম থেকেই করা। মস্কোর শেষ দিন পর্যন্ত আমি এখানেই ছিলাম।

১৯৯৪ সালের ১৮ মে আমি জয়েন করি দুবনার জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চে। নতুন আবাস হয় সেখানে, যদিও মস্কোর একটা ফর্মাল ঠিকানা থেকেই যায় লেনিনস্কি প্রোসপেক্টের ৬৯ নম্বর বাড়ির ১০০ নম্বর ফ্ল্যাটে গুলিয়ার ওখানে ১৯৯৯ সালে রুশ নাগরিকত্ব পাবার পরে। তবে থাকা হয় নি। দুবনায় প্রথম দু বছর ছিলাম হোটেলে। ১৯৯৬ সালে ফ্যামিলি দুবনা এলে চলে যাই লেসনায়া ৫ এ। ১৯৯৯ থেকে থাকতে শুরু করি পন্তেকরভো ৫ এ। ২০০৯ সালে লেনিনস্কি প্রোসপেক্টের বাসা বিক্রি করলে ফর্মাল ঠিকানা হয় বলশায়া চেরেমুশকিনস্কায়ায়, তবে ২০০৯ সালেই মেট্রো স্পোরতিভনায়ার পাশে দভাতরা রোডে একটা রুম কেনে গুলিয়া। কিছুদিন আগে বলশায়া চেরেমুশকিনস্কায়ার বাসা বিক্রি করলে আমার ঠিকানা আবার বদলায়। ২০১৭ সালের  ডিসেম্বরে এই প্রথম যাই দভাতরার বাসায়, উদ্দেশ্য আইডিয়া নেয়া ওখান থেকে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে যেতে কতক্ষণ সময় লাগবে।

দুবনা থেকে আসার পথে আন্তনকে ফোন করে জানলাম ও বাসায় কি না আর আমি স্পোরতিভনায়া এলে ও আমাকে মিট করতে পারবে কি না। ও বাসায়ই ছিল। আমাকে নিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে আমার মনে হল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যেতে হবে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরের যা তা অবস্থা। এক তলায় ঘর। অনেক পুরানো বাড়ি, জারের আমলের মনে হয় (আসলে ১৯২৯ সালের)। গুলিয়া বলেছিল ঘরে কিছু জিনিষপত্র সরাতে যাতে বলশায়া চেরেমুশকিনস্কায়া থেকে জিনিষপত্র এখানে আনতে পারি। আমি ফোন করে বললাম, আমি এখানে থাকছি না। এখুনি বেরুচ্ছি।

এই বাসায় যখন আরেকটা রুম কেনে গুলিয়া বিভিন্ন যুক্তি দিত যে মেট্রোর সাথেই বাসা, সেন্ট্রাল এরিয়ায়, তাই পলিক্লিনিক, হসপিটালসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা অনেক। এই এলাকায় আমি এর আগে প্রচুর এসেছি। এখানে আমার বন্ধু দীপু পড়ত ফার্স্ট মেডিক্যালে। পাশেই আমার প্রিয় নভদেভিচি মনাস্তির, লুঝনিকি স্টেডিয়াম। সোভিয়েত আমলে অনেক এসেছি এই স্টেডিয়ামে বিশেষ করে আইস হকি দেখতে – তাই বাসা না দেখলেও আপত্তি করিনি। বাসায় ফিরলে গুলিয়া জিজ্ঞেস করল

- কেমন দেখলে বাসা?

- এক টুকরো নরকের মত।

- কিন্তু চারিদিকটা স্বর্গের মত সুন্দর। একটু রিকনস্ট্রাকশন করলেই দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।

- আগে কর।

আমার সবচেয়ে খারাপ লাগছিলো মনিকা-ক্রিস্তিনা এখানে থাকবে বলে। তবে স্বর্গের ভেতর এক টুকরা নরক এ কথাটা যেন মনে গেঁথে রইলো পরবর্তী কয়েকদিন। মনে পড়ল বিশাল উঁচু প্রাচীরের ভেতরে অট্টালিকায় বাস করা মানুষগুলোর কথা যারা দামী দামী গাড়িতে বাসায় ঢোঁকে আর বাসা থেকে বেরোয়, স্বর্গটা সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর ভয় পায় বাইরে বেরুতে পাছে নরকের দেখা মেলে। এরকম নিজ নিজ স্বর্গে বাস বর্তমান যুগের ফ্যাশান। তাই গুলিয়াকে বললাম

- জান, আমার কিন্তু এই নরকটাই ভালো লাগছে। চাবি তো আমাদের হাতেই। যখন খুশি স্বর্গে বেড়াতে যাব, আর স্বর্গসুখে ক্লান্তি এলে আমাদের নরকে ঢুকব। তাছাড়া হাল্কা চুনকাম করলে, দরজা বদলালে আমাদেরটাও দেখতে দেখতে এক টুকরা স্বর্গ হয়ে যাবে।

হ্যাঁ তাই। নিজের ছোট্ট প্রাসাদে জীবন কাটালে দু’ দিন আগে হোক আর দু’ দিন পরে হোক, কুপমণ্ডক হয়ে যেতে হবে। এটা অনেকটা কচ্ছপের জীবনের মত। যেখানেই যাও নিজের ঘর সাথে করে নিয়ে যাও, আর মাথা বের করলেই হাজারো বিপদের সম্মুখীন হও। তার চেয়ে অনেক ভালো যখন চারিদিকে মুক্ত আলো হাওয়া, পাখির ডাক, শিশুদের কোলাহল। আমার তো মনে হয় নরক বেষ্টিত স্বর্গের থেকে স্বর্গ বেষ্টিত নরক অনেক ভালো। অংকও তাই বলে। গড়পড়তা হিসেব নিলে নরক বেষ্টিত স্বর্গের নরকত্ব যে হারে বাড়ে, ঠিক সে হারেই বাড়ে স্বর্গ বেষ্টিত নরকের স্বর্গত্ব।

আমার বউ কিছু করে তারপর তার জন্য অজুহাত খোঁজে আর আমি সেটাকে খণ্ডন করি। এই প্রথম আমিও তার কাজের সপক্ষে যুক্তি খুঁজছি।

ইতিমধ্যে কেটে গেছে অনেক সময়। এখন নিয়মিত মস্কো যাই, ওখানে থাকি। মেট্রোর সাথে বলে ছেলেমেয়েরা একা থাকলেও দুশ্চিন্তা হয় না (অবশ্য দূরে থাকলেও হত না, এখানে এখন কমবেশি সেই সোভিয়েত আমলের মত – অন্তত নিরাপত্তার ব্যাপারে)। সবচেয়ে যেটা ভাল লাগে তা হল এই জায়গার নির্জনতা। আগের সবগুলো বাসা ছিল মস্কোর ব্যস্ত রাস্তাগুলোর উপর। তাই রাত নেই দিন নেই গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে তো আসছেই। যদিও বর্তমান বাসা মস্কোর প্রায় কেন্দ্রে, মিনিট চল্লিশ হাঁটলেই ক্রেমলিনে পৌঁছে যাওয়া যায় – কিন্তু গাড়িঘোড়ার সেই শব্দ নেই। বড় রাস্তাগুলো একটু দূরে। মনে পড়ে প্রথম রাতের কথা। এর আগে কখনও একতলায় থাকিনি মস্কোয়। দুবনায় লেস্নায়ার বাসা ছিল এক তলায়, আর বাসা ছিল বনের ভেতর। সেটার জন্য রকম আবেদন ছিল। কিন্তু সেদিন মস্কোয় ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে, অনেকটা দেশে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার মত। মনে হল আমি যেন গ্রামের বাড়িয়ে শুয়ে আছি। আসলে স্বর্গ নরক তো মানুষের নিজের মধ্যেই। সে কিভাবে প্রকৃতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেবে, কিভাবে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেবে তার উপর নির্ভর করে কোন জায়গা তার জন্য স্বর্গ হবে নাকি নরক।

দুবনা, ২২ আগস্ট ২০২২

বিঃ দ্রঃ লেখাটি ২৩ আগস্ট ২০২২ ভালোভাষায় প্রকাশিত হয়েছে 

https://bhalobhasa.com/russia-through-the-eyes-of-bijan-saha-the-cosmology-research-scientist-part-12/



 


Friday, August 12, 2022

দাঁত

 

আমাদের দেশে জামাই আর শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে ভাল ভাল গল্প চালু আছে। যেমন জামাই ষষ্ঠী, জামাই আদর – এ সবই জামাইয়ের প্রতি শাশুড়ির দরদের কথাই প্রকাশ করে। সেটা হয়তো এ কারণে যে আমাদের দেশে বিয়ের পর মেয়ে বাবার বাড়ি ছেড়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। সেটাই হয় তার নতুন ঘর, নতুন বাড়ি। এখানেই গড়ে ওঠে তার নতুন জীবন। বাপের বাড়ি সে আসে কালেভদ্রে। আর যেহেতু স্বামীর বাড়িই তার জন্য সব তাই সেই বাড়িতে মেয়ে যাতে আদর যত্ন পায় সেকারণেই হয়তো শাশুড়ি জামাইকে বেশি আদর করেন। তবে রাশিয়ার কথা একেবারেই আলাদা। এখানে তেমন কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই কে কোথায় থাকবে – স্ত্রী স্বামীর বাড়ি নাকি উল্টোটা। সোভিয়েত আমলে এ দেশে বেশ জটিল এক সিস্টেম ছিল – যার কারণে প্রতিটি মানুষ কোন না কোন এলাকায় বলা যায় গৃহবন্দী থাকত। না, ঠিক জেল নয়, তবে কাছাকাছি। সে সময় সব কিছুই হত সরকারি খরচে – লেখাপড়া থেকে শুরু করে সব। সরকার নিজের ঠিক করত কোথায় কতজন বিশেষজ্ঞ দরকার, সেভাবেই তারা তৈরি হত আর সেই অনুযায়ী পাশ করার পর ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হত। সেখানে গেলে তারা কাজ পেত, পেত থাকার জায়গা ইত্যাদি। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের ছিল নির্দিষ্ট জায়গায় একটা স্থায়ী ঠিকানা। আর শুধু এই অফিসিয়াল স্থায়ী ঠিকানা থাকলেই সেই এলাকায় সে কাজ পেত, পেত চিকিৎসা, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা। এক কথায় জীবন যাপন করতে যা কিছু লাগে সব। কিন্তু অন্য কোথাও গেলে তার না থাকত কাজ, না থাকত বাসস্থান। হ্যাঁ, হোটেলে থাকা যেত, তবে সেটা সাময়িক। হোটেলের ঠিকানা দেখিয়ে কোথাও কাজ পাওয়া যেত না। তাই বললাম – সে ছিল গৃহবন্দী। এই স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া যেত সরকার থেকে, মানে সরকার নিজে থেকে যখন কাউকে কোথাও কাজ দিত, তখন সে থাকার ব্যবস্থাও করত। আর একটা উপায় ছিল – বিয়ে করা। অর্থাৎ কেউ বিয়ে করলে স্বামী বা স্ত্রীর ওখানে আইনত স্থায়ী ঠিকানা পেত আর সেক্ষেত্রে তাকে আগের ঠিকানা বা সেখানকার স্থাবর সম্পত্তির উপর অধিকার ত্যাগ করতে হত। অধিকার মানে যেহেতু সবই ছিল সরকারি সম্পত্তি, তাই চাইলেই বাবা মার পরে সে সেখানে ফিরে যেতে পারত না, এসব সরকারের হাতে ফেরত যেত। তবে বাবা মা চাইলে তাদের বাসা ছেলে বা নাতি নাতনীদের নামে লিখে দিতে পারত। কিন্তু কথা একটাই, কারও একটার বেশি বাসা থাকতে পারবে না। সে কারণেই অনেকেই, বিশেষ করে যারা গ্রাম বা ছোট শহর থেকে বড় শহরে আসত পড়াশুনা করতে, চেষ্টা করত এ সব শহরের ছেলেমেয়েদের সাথে প্রেম করে পরবর্তীতে বিয়ে করতে। আর একবার সেটা হয়ে গেলে সেখানে কাজের অভাব হত না। এটাকে ব্যবহার করে অনেকে যেমন কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করত, অনেকে আবার শুধু বড় শহরে থাকার জন্যই বিয়ে করত প্রেমের ভান করে। সেসব বিয়ে না টিকলে পরে ছাড়াছাড়ি আর সম্পত্তির ভাগ – মানে আগের বাড়ি বদলিয়ে তাদের আলাদা আলাদা কোথাও থাকার ব্যবস্থা করা হত। এক্ষেত্রে যে স্থানীয় সে ক্ষতিগ্রস্থ হত, কেননা তার বাসায় ভাগ করে অপর পক্ষকে দেওয়া হত। আর যেহেতু এতে শ্বশুর বা শাশুড়ি (কেননা বাসাটা তো তাদেরই ছিল) ক্ষতিগ্রস্থ হতেন – তাই এখানে বিশেষ করে জামাই ও শাশুড়ির সম্পর্ক ছিল সাপে নেউলে। অন্তত সেটাই বলা হয়ে থাকে আর সে নিয়ে এদেশে হাস্যরসের শেষ নেই।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে শাশুড়ির ওখানে থাকিনি, কেন না আমাদের যখন পরিচয় হয় তখন আমার হবু স্ত্রী আলাদা বাসায় থাকত। তবে মস্কো থাকাকালীন তিনি প্রায় প্রতিদিন আমাদের বাসায় আসতেন বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে। সে সময় তিনি পেনশনে ছিলেন আর এদেশের দাদা-দাদীদের কাজই নাতি নাতনির দেখাশনা করা। তাছাড়া আমি যেহেতু দুবনায় থাকতাম, তাই আমার সাথে দেখা হত কম। পরে আমরা সবাই মিলে দুবনায় চলে গেলে তিনি মাঝেমধ্যে আমাদের সাথে এসে থাকতেন। তাতে ছেলেমেয়েরাও যেমন খুশি হত, আমরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম। শত হলেও আমাদের সংসার ছিল বড়। একা আমার স্ত্রীর পক্ষে সব দিক সামাল দেওয়া সম্ভব হত না। তবে উনি প্রায়ই হাসপাতালে থাকতেন। স্ত্রীর ভাষায় এটাই ছিল তার অসুখ – কাড়ি কাড়ি ট্যাবলেট খাওয়া আর হাসপাতালে গিয়ে থাকা। আর এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হত। আমি ছিলাম নীরব দর্শক।

একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি মহা হইচই। শাশুড়ি নাকের জলে চোখের জলে সব একাকার করে ফেলেছে আর আমার স্ত্রীকে অনুরোধ করছে ডাক্তার ডাকতে। আমি একটু বিরক্ত হয়েই জানতে চাইলাম

কী হল তোমাদের?    
বাবুশকা (দিদিমা) বলছে সে নাকি তার দাঁতের প্রটেজ গিলে ফেলেছে। - মনিকা জানাল।
তা মাকে বল দেখতে।
মা বলছে দেখতে পারবে না। আর বাবুশকা ভয়ে কাঁদছে।
মহা মুস্কিল। আমি গুলিয়াকে বললাম এটা একটা সুরাহা করতে।

তোমার দরকার হয় তুমি কর। আমি এসব নাটকে অংশ নিতে পারব না।
অন্তত কান্নাকাটি যাতে না করে সে ব্যবস্থা কর।
আমি কী করব?

ঐ সময় আমাদের বাসায় টেলিফোন ছিল না। তখন মোবাইলের যুগ সবে শুরু। ওসব আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। খুব জরুরি কাজ থাকলে আমাদের ফ্ল্যাটের উপরে যারা থাকতেন তাদের ওখানে গিয়ে ফোন করতাম।

ঠিক আছে, তুমি আমাকে বল কী হয়েছে। আমি দেখি ডাক্তারকে ফোন করে অন্তত জানার চেষ্টা করি কি করতে হবে।
কিছুক্ষণ আগে মা হইচই শুরু করল যে জল খেতে গিয়ে ভুলে প্রটেজ গিলে ফেলেছে। সেই তখন থেকে কান্নাকাটি। ডাক্তার ডাকতে বলছে। কিন্তু আমি ডাক্তারকে কী বলব? যদি মনে কর, যাও, ফোন করে জান কী করতে হবে।

আমি সব খবর জেনে গেলাম উপরের ফ্ল্যাটে। আসলে ব্যাপারটা এতই ডেলিকেট যে অন্যদের সামনে এ ব্যাপারে ফোন করাটাও হাস্যকর। কিন্তু উপায় নেই। অকাহ্নে তখন থাকত চার জেনারেশনের এক সম্পূর্ণ মহিলা পরিবার। অনেক বয়স্ক দিদিমা, তার মেয়ে সভেতা (আমাদের চেয়ে একটু বড়), সেভতার মেয়ে আর নাতনি ইউলিয়া। ইউলিয়া ছিল মনিকার সমবয়সী, প্রায়ই একসাথে খেলাধুলা করত। ইউলিয়া বেড়াতে আসত আমাদের বাসায়, মনিকা যেত ওর ওখানে। যাহোক, গেলাম ওদের ওখানে। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমেছে। ফোন করতে হবে ইমারজেন্সিতে।

কলিং বেল টিপতেই সভেতা দরজা খুলল।

প্রিভিয়েত সভেতা।  
প্রিভিয়েত। কেমন আছ?
ভাল। তোমরা ভাল?
চলে যাচ্ছে। তোমার কি ফোন করা দরকার?

ওরা জানে ফোন করার দরকার হলেই সাধারণত আমরা বড়রা কেউ আসি।
হ্যাঁ, যদি কিছু মনে না কর।  
অবশ্যই।

বাসার অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করে ও ঘরে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত ফোন করলাম ইমারজেন্সিতে। ০৩ কল করতেই ওদিক থেকে মহিলার সুরেলা কণ্ঠ

শুভ অপরাহ্ন, আপনাকে শুনছি।
শুভ অপরাহ্ন। আমার বাসায় বাবুশকা মনে হয় জল খেতে গিয়ে প্রটেজ গিলে ফেলেছেন। খুবই নার্ভাস দেখাচ্ছে তাকে। কান্নাকাটি করছেন। কী করতে পারি এখন?
বয়স কেমন?  
ষাটোর্ধ।
তাকে প্রথমে শান্ত হতে বলেন। আর এমতাবস্থায় তেমন কিছু করার নেই। বলেন প্রাকৃতিক পথেই প্রটেজ বেরিয়ে যাবে। ভয়ের কোন কারণ নেই। 

আমি বাসায় ফিরে সেটা জানাতে শুরু হল হাঁসির জোয়ার। নাতি নাতনিরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো

বাবুশকা, ভয়ের কিছু নেই। তুমি বাথরুম কর, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। গুলিয়াও ওদের সাথে যোগ দিল। এসব দেখে বাবুশকার অবস্থা আরও খারাপ।  আমি এগিয়ে এলাম তার সাহায্যে

এই যে আপনি বলছেন প্রটেজ গিলে ফেলেছেন। কিন্তু  সেটার তো গলায় আটকে যাওয়ার কথা। আপনি কিছু টের পাননি?
না, একেবারে টের পাইনি।
ভাল। তাহলে আপনি বুঝলেন কি করে যে ওটা ঠিক ঠিক গিলে ফেলেছেন?
আমার তাই মনে হচ্ছে। 
তার মানে আপনি শিওর নন যে সেটা গিলেছেন কি গিলেন নাই – তাই তো?
হ্যাঁ।
তাহলে তো প্রথমেই দেখতে হবে প্রটেজ জায়গা মত আছে কিনা। এক কাজ করুন, বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ান, দেখুন ওটা আছে কি নেই। আমি অপেক্ষা করছি। 

 

আসলে প্রটেজ গিলে ফেলেছেন তাই লজ্জায় তিনি এতক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলছিলেন হাত দিয়ে মুখ ঢেকে। ফলে দাঁত জায়গা মত আছে কি নেই সেটা জানার কায়দা ছিল না। তাই ওনাকে পাঠিয়ে দিলাম বাথরুমে আয়নার নিজের মুখ দেখতে। ছেলেমেয়েরাও চলল তার পেছন পেছন।

কয়েক মিনিট পরে পাশের ঘরে ছেলেমেয়েদের অট্টহাসি। গুলিয়াও তাতে যোগ দিয়েছে।

কী হল আমার?
কিছুই না। বাবুশকার দাঁত পাওয়া গেছে।
কোথায়?
মুখের ভেতরে। এতক্ষণ সেখানেই ছিল। উনি এতক্ষণ ভয়ে মুখের ভেতর প্রটেজ আছে কিনা সেটা চেক করতে ভুলে গেছিলেন।
যাক, বাঁচা গেল।

মনে মনে ভাবলাম, চিল শুধু কানই নেয় না, দাঁতও নেয়।

এরপর এই ঘটনা বাসায় গল্পের এক মুখরোচক উপাদান হিসেবে কাজ করে। বাবুশকা কিছু হারিয়েছে বললেই সবাই তাকে সেই ঘটনা মনে করিয়ে দিত।


দুবনা, ১০ আগস্ট ২০২২

বিঃ দ্রঃ লেখাটি ১২ আগস্ট জ্বলদর্চি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে 

https://www.jaladarchi.com/2022/08/teeth-bijan-saha.html



 

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...