অনেকদিন আগে বন্ধু পেনকভ বলেছিল যদি আমেরিকান, ভারতীয়, বাংলাদেশি – এসব তুমি কে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়, তাহলে রুস্কি – এটা শুধু কে নয়, কেমন সেই প্রশ্নেরও উত্তর। মানে রুস্কি শুধু জাতি, দেশ এসবের সাথেই সম্পর্কিত নয় – এটা মানুষের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। রুস্কি চেলাভেক – রুশ মানুষ – এটা এক ধরণের বিশেষ মনোভাবের মানুষ। এজন্যেই হয়তো বলে রাশিয়াকে বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় না। আজ প্রায় দেড় মাস ধরে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু লোকজনের মধ্যে তেমন উত্তেজনা নেই। সবাই কাজকর্ম করছে। অফিসে এ নিয়ে তেমন কথা হয় না। সাঁতার কাটতে গিয়ে সুইমিং পুলে, সাওনায় অনেকের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। তবে যুদ্ধ নিয়ে তেমন কোন কথা হয় না। রাস্তাঘাট, দোকানপাট – সব একই রকম, তবে হাজার হাজার শরণার্থী আসছে। সবাই যে যেভাবে পারছে সাহায্য করছে। আমি কয়েক ব্যাগ ভর্তি জামাকাপড়, জুতা, জ্যাকেট এসব দিয়ে এসেছি। মানে মানুষের অংশগ্রহণ যে নেই তা নয়। আসলে এ দেশের মানুষ এমনই। সাধারণত কারও ব্যাপারে নাক গলায় না, কাউকে পছন্দ না হলে সেটা বুঝতে দেয়। আমাদের মত মুখে হাসি মনে বিষ এমন নয়। সরকারকে নিয়েও এদের তেমন মাথা ব্যথা নেই। জানে নিজেরটা নিজেরই করে খেতে হবে। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখব এরা শক্ত হাত পছন্দ করে। আগেই লিখেছি এরা নিজে থেকেই নভগোরাদের স্ক্যান্ডিনাভিয়ান রাজা রিউরিককে ডেকে এনে নিজেদের নেতা করে। পরবর্তীতে এই বংশের পতন ঘটলে নিজেরা পঝারস্কি আর কুজমা মিনিনের নেতৃত্বে যুদ্ধ দেশ পোল্যান্ডের হাত থেকে দেশ মুক্ত করে রোমানভ বংশের পত্তন ঘটায়। গণতান্ত্রিক না হলেও কী রিউরিক, কী মিখাইল রোমানভ – জনগণ দ্বারা নির্বাচিত। আগেই বলেছি যখনই এ দেশে শক্তিশালী নেতার আবির্ভাব ঘটেছে – এদেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। এরা শক্ত হাতে ক্ষমতার ভার দিয়ে নিজেদের কাজে নেমে পড়ে। সোভিয়েত আমলেও ভিন্ন কিছু ছিল না। তবে একটা ব্যাপারে এরা এক – দেশ যখন বিদেশী শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় এরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। সোভিয়েত আমলে চার্চের উপর শত অত্যাচারের পরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চ যুদ্ধে নামে। এরা এসব যুদ্ধকে বলে মহান পিতৃভূমির যুদ্ধ। এরা নেতাদের সব দোষ ক্ষমা করতে পারে কিন্তু পরাজয় ক্ষমা করতে পারে না। এই দেশের উপর, এদেশের নেতৃত্বের উপর যত বেশি বাইরের চাপ আসে তত বেশি এরা নেতার পেছনে এককাট্টা হয়ে দাঁড়ায়। সেটা দেখেছি স্তালিনের সময়। ক্যারিবিয়ান সংকটে। আবার কোন নেতার প্রতি বাইরের দেশ খুব বেশি সদয় হলে এরা তাদের সন্দেহ করে। নিকট অতীতে এমনটা ঘটেছে গরবাচভের সাথে, ইয়েলৎসিনের সাথে। কিন্তু যখনই প্রিমাকভ আটলান্টিকের মাঝপথ থেকে বিমান ঘুরিয়েছেন বা রুশ সেনারা ন্যাটোর আগে প্রিস্টিনা বিমানবন্দর দখল করেছে – দেশের মানুষ সেটাকে সমর্থন করেছে। রুশদের সাইকোলজি বুঝতে পশ্চিমের ব্যর্থতাই বার বার তাদের স্যাঙ্কশন সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ ব্যর্থ করে দিচ্ছে। আসলে আমাদের দেশে যদি পাপ – পুণ্য, পশ্চিমা বিশ্বে আইনসঙ্গত – বেআইনি এসব ধারণা জনগণের চিন্তায় প্রথম সারিতে থাকে, এদের ক্ষেত্রে সেটা ন্যায় – অন্যায়। আর এ কারণেই হয়তো পশ্চিমা বিশ্বের মানবতার মুখোশ এরা বার বার খুলে দিচ্ছে আর সেখান থেকে বার বার বেরিয়ে আসছে মধ্যযুগীয় বর্বর ইউরোপ।
যুদ্ধ শুরুর পরে শিল্পী, অভিনেতা সহ অনেক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব রাশিয়া ত্যাগ করেছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন মত আছে, তবে তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের ডাক ক্রেমলিন খারিজ করে দিয়েছে। আসলে এই যুদ্ধের পরে সমাজে মেরুকরণ ঘটেছে, সবার মুখোশ খুলে গেছে। এখানে আমার চিন্তা ভাবনা এমন। আমি নিজে দেশের বাইরে ১৯৮৩ থেকে। এরকম অনেক লোককে জানি যারা দেশের বাইরে থাকেন। কিন্তু এরা সত্যিকার অর্থেই হৃদয়ে বাংলাদেশ ধারণ করেন। তারা দেশের ভালমন্দ নিয়ে ভাবেন, এর সুখে সুখী, দুখে দুঃখী হন। এদের অনেকেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখেন। আবার অনেকেই আছে যারা দেশে বাস করেন, সেখানে উপার্জন করেন আর অর্থ পাচার করেন উন্নত বিশ্বে। এরা আর যাই হোক দেশ নিয়ে ভাবে না, দেশ তাদের জন্য উপার্জনের জায়গা। একই ভাবে আজ যারা রাশিয়া থেকে চলে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই এই দেশে উপার্জন করতেন আর শপিং করতেন মিলান, প্যারিস, লন্ডন আর নিউ ইয়র্কে। এদের অনেকেই এদেশের মানুষের সাথে একাত্মতা বোধ করতেন না। অনেকেই সরকারি অনুদান পেতেন। এক কথায় দেশের খেয়ে দেশে হাগতেন। তাই এদের অনুপস্থিতি রাশিয়া খুব একটা অনুভব করবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এরা কি পারবে নিজেদের সেখানে মানিয়ে নিতে। তাদের পণ্যের মূল ক্রেতা ছিল রুশ জনগণ। এই সব শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতারা ওখানে কি করবেন। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে হয়তো সেসব দেশে ফ্লোর পাবেন, কিন্তু যুদ্ধ শেষে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তখন? তাছাড়া এখন যেভাবে রুশোফোবিয়া পশ্চিমা বিশ্বে শেকড় গেড়েছে তাতে সাধারণ মানুষ সেখানে তাদের কতটা গ্রহণ করবে সেটাও ভাবার বিষয়।
বর্তমানে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে – পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক স্যাঙ্কশন যত কম এফেক্টিভ হচ্ছে ন্যাটো তত আগ্রাসী হচ্ছে। নতুন নতুন স্যাঙ্কশন দিচ্ছে, নতুন নতুন অস্ত্র পাঠাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধ যতদূর সম্ভব দীর্ঘায়িত করা। তবে এতে যে শুধু রাশিয়াই ক্ষতিগ্রস্থ হবে তা নয়, ইউরোপ, আমেরিকা সহ সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। তখন দেখা যাবে কার সহ্যশক্তি কত বেশি। আর তার উপরেই নির্ভর করবে যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে আমেরিকা রাখঢাক না করেই স্বীকার করছে যে তারা বিগত বছরগুলোতে ইউক্রেনের সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার। আজোভ ব্যাটেলিয়নের যারা ধরা পড়ছে নাম শুনে মনে হয় এদের অধিকাংশই জাতিগত ভাবে রুশ। তবে যুদ্ধ না করে যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের বেশীর ভাগ পশ্চিম ইউক্রেনের। কেন? আসলে পশ্চিম ইউক্রেনের লোকেরা কখনই তেমন একটা যুদ্ধ করেনি। তারা সব সময়ই যখন যে রাজা এসেছে তাদের আনুগত্য স্বীকার করেছে। ফলে তারা পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে ইউরোপে। এমনও শুনেছি পূর্ব ইউক্রেন থেকে যারা পালিয়ে পশ্চিম দিকে যাচ্ছে পশ্চিম ইউক্রেনের লোকেরা তাদের কাছে বাসা ভাড়া দিয়ে নিজেরা ইউরোপের দিকে যাচ্ছে। আর এদের অনেকেই বিশেষ করে এলিটদের অনেকেই পালিয়ে যাচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করে। এমন অনেকে ধরা পড়েছে হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এসব বর্ডারে। তাছাড়া পালিয়ে যাচ্ছে এই সব লোকজন যাদের কথা ছিল দেশের হয়ে যুদ্ধ করার। এ নিয়ে ইউরোপে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয় এরা ইউরোপে গিয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়েছে। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা পতিতাবৃত্তিতে নামতে বাধ্য হচ্ছে। এ নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে। এছাড়া ইউক্রেনের অনেকেই বিভিন্ন দেশে রুশদের উপর হামলা করছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মদানকারী সোভিয়েত সৈনিকদের মনুমেন্ট ভাংচুর করছে। তাই যুদ্ধ হচ্ছে মূলত রুশদের সাথে রুশদের। আর এরা যুদ্ধ করতে জানে। এভাবেই পশ্চিমা বিশ্ব এদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ লাগিয়ে নিজেদের মানবিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করছে। প্রায় প্রতিদিনই মারিওপোলে ইউক্রেনের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করছে। ওরা বলছে আত্মসমর্পণ করলে ওদের মেরে ফেলা হবে এরকম ভয় দেখানো হয়েছিল। এখন বুঝছে এটাই জীবন বাঁচানোর একমাত্র পথ। তাছাড়া মানুষের মৃত্যু দেখতে দেখতে ফেড আপ হয়ে গেছে বলেও অনেকে স্বীকার করেছে।
এখানে একটা জিনিস উল্লেখ করা দরকার। আমরা কথায় কথায় স্বাধীনতার কথা বলি, মুক্ত চিন্তার কথা বলি। আচ্ছা আজ কয়টা দেশ স্বাধীন? সত্যের কোন একটা রূপ নেই। এক জনের দৃষ্টিতে যা সত্য অন্যের দৃষ্টিতে তা মিথ্যা হতে পারে। তাছাড়া পশ্চিমা বয়ানই যে শেষ কথা তার তো কোন মানে নেই। এখন এই যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনা হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষ থেকে। আমি জানি গতকাল কেউ কোন ঘটনার প্রতিবাদ না করলেও আজ সে অনুরূপ ঘটনার বিরুদ্ধে বলতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় এরপর থেকে এধরনের যেকোনো ঘটনার প্রতিবাদ করা। সবাই জানে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ায় আমেরিকার ভূমিকার কথা। যে বাইডেন পুতিনকে খুনী বলছেন তিনিই ১৯৯২ সালে বেলগ্রাদ আক্রমণের পক্ষে ওকালতি করেন। ইরাক ও লিবিয়ার যুদ্ধেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। জুলিয়ান আসাঞ্জ এর প্রতিবাদ করে জেলের ভাত খাচ্ছেন। আজ যে কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে স্যাঙ্কশন দেওয়া হচ্ছে তার শত গুন অপরাধে অপরাধী আমেরিকা কিন্তু সব সময়ই বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে। এটা আমাদের দেশে কিছু কিছু বিশেষ আসামীর মত। ইউরোপ, আমেরিকায় বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশিকে দেখি দেশে এমন কিছু ঘটলে বিষ উগরে দেন, অথচ আমেরিকার অন্যায় হজম করে যান, দরকারে হজমি খেয়ে সেটা করেন। এদের দেখে আমি বুঝি কেন বাংলাদেশের অনেক লোকজন ভারতে কোন মুসলমানের উপর অত্যাচার হলে প্রতিবাদে সোচ্চার হন, অথচ এরাই বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচার দেখেও মুখ খুলে না। ঠিক এর উল্টটা ঘটে ভারতে – মানে যারা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করে তারা ভারতে মুসলমানদের উপর অত্যাচারের ব্যাপারে নিশ্চুপ। আসলে এটা এক ধরণের মানসিক রোগ যখন আগে থেকেই ঠিক করা হয় কাদের প্রতি আমরা সহানুভূতিশীল হব আর কাদের প্রতি নিস্পৃহ।
আচ্ছা কেউ কি মনে করেন ব্রিটিশরা ভারতীয়দের পছন্দ করত? আমার তো মনে হয় তারা হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষ সমস্ত ভারতীয়দের একই রকম অবজ্ঞার চোখে দেখত। কিন্তু কখনও হিন্দুদের, কখনও মুসলমানদের মাথায় হাত বুলিয়ে এদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করত। ফলাফল – দেশভাগ, তবে তার চেয়েও ভয়ংকর – লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু। আজ পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের ভালবেসে নয়, তাদের হাত দিয়ে যত বেশি সম্ভব রুশ হত্যা করার জন্য। তারা ভাল ভাবেই জানে রুশ, বেলারুশ আর ইউক্রেনিয়ান – এরা প্রায় একই জাতি। এখন তারা মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে এদের বিভক্ত করছে। ডিভাইড অ্যান্ড রুল – এটা এদের অমূল্য আবিষ্কার।
অনেককেই দেখি শুধু পুতিন বিরোধিতা থেকে পশ্চিমের সব কিছু জায়েজ করে দেয়। পুতিনের প্রতি বিভিন্ন মনোভাব থাকতেই পারে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা যদি অন্ধ ঘৃণা হয় তাহলে বিপদ। আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর অনেক কিছুই অপছন্দ করি। সত্যি বলতে কি আমি কারোই সবকিছু পছন্দ করি না। কারও মধ্যে পছন্দ করার মত কিছু থাকলে পছন্দ করি, ঘৃণা করার মত কিছু থাকলে সেটা করতেও পিছ পা হই না। আমার কাছে কোন কিছুর ভালোমন্দ কে করল তার উপর নির্ভর করে না, কি করল সেটাই বড় কথা। পুতিনের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটা রাশিয়াকে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা আর আমেরিকার বিরুদ্ধেও যে দাঁড়ানো যায় সেটা দেখানো। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা হয় বিশ্বের একচ্ছত্র অধিকারী। কেউই তখন তার প্রতিবাদ করতে পারত না। আমেরিকার কথাই ছিল আইন। তাই বেলগ্রাদ আক্রমণ সবাই হজম করে যায়। করবেই বা না কেন? যদি ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে অসংখ্য আমেরিকান ঘাটি থাকে তবে তার কথা না মেনে উপায় আছে? ঠিক এরকম এক সময়ে ২০০৭ সালে পুতিন মিউনিখে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করেন। সবাই হেসেছিল, কারণ রাশিয়া তখন তাদের চোখে ছিল পেট্রল পাম্প। কয়েক বছর পরে আমেরিকা যখন বাংলাদেশের এক মন্ত্রীকে সরানোর কথা বলে শেখ হাসিনা তা করতে অস্বীকার করেন। ফলে বন্ধ হয় আইএমএফ-এর ঋণ। কিন্তু পদ্মা সেতু তৈরি হয়। হ্যাঁ, সেদিন সেটা সম্ভব হয়েছিল একটাই কারণে – পুতিন সবাইকে দেখিয়ে দেন আমেরিকার সাথে একমত না হয়েও বেঁচে থাকা যায়। তাঁর মানে এই নয় যে শেখ হাসিনার কোন ক্রেডিট নেই। তাঁর বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সেটা করতে সাহায্য করেছিল। এর অনেক পরে ২০১৫ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কথায় ইউক্রেন সেদেশের প্রসিকিউটর জেনারেলকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তাই শুধু সুযোগ থাকলেই হবে না, সেটা ব্যবহার করার মনোবল থাকতে হবে। মতিলাল নেহরু বলেছিলেন “গান্ধীর সাথে দ্বিমত করার ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি – উই এগ্রিড টু ডিস্যাগ্রি” আসলে গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র হল দ্বিমত প্রকাশের অধিকার। কিন্তু এখন আমরা কী দেখি? যেসব দেশ আমেরিকার সাথে একযোগে রাশিয়ায় নিন্দা করতে অস্বীকার করছে – তাদের উপর নেমে আসছে প্রচণ্ড চাপ। আর সে যে দেশই হোক – চীন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা যেই হোক। এই বিশ্বে কি আমরা বাস করতে চাই? আমার বিশ্বাস যদি এই যুদ্ধে রাশিয়া হারে তবে আমেরিকা হবে সেই দানব যার দুপুরের খাবারের জন্য প্রতিদিন একটা করে দেশ পাঠাতে হবে। তাই এই যুদ্ধ শুধু রাশিয়ার অস্তিত্বের যুদ্ধ নয়, এটা বিশ্বের প্রতিটি দেশের স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের যুদ্ধ। তাই এই যুদ্ধে বিজয়ের কোনই বিকল্প নেই।
যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব অনবরত হুমকি দিয়ে আসছিল এই স্যাঙ্কশন দেবে সেই স্যাঙ্কশন দেবে বলে। তাদের ধারণা ছিল কয়েকটি স্যাঙ্কশন দিয়েই রাশিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামানো যাবে। যুদ্ধের শুরুর মুহূর্তে এক ধরণের প্যানিক যে সৃষ্টি হয়নি তা নয়। সেই এক দিনে মানুষ এক ট্রিলিয়ন রুবল ব্যাংক থেকে নামিয়ে নেয়। তবে এ নিয়ে কোন সমস্যা হয়নি। সবাই সেটা করতে পেরেছে, কোথাও লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। একের পর এক বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবার ফলে কিছু কিছু জিনিস কেনার হিড়িক লাগে। মনে আছে, ওই সময় মেয়ে বলল ও স্যানিটারি প্যাড খুঁজে পাচ্ছে না (একেবারে নেই তা নয়, ও যে কোম্পানির প্যাড ব্যবহার করে সেটা নেই)। আমি দোকানে গিয়ে কিছু কিনে আনলাম, ওয়াইল্ড বেরিতে কিছু অর্ডার দিলাম। মাঝে চিনির অভাব ছিল। আসলে পরে ব্যবসায়ী বন্ধুদের কাছে শুনলাম যেহেতু প্রথম দিকে ডলারের দাম প্রতিদিন বাড়ছিল, তাই অনেক কোম্পানি ইচ্ছে করে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করেনি। পরে অবশ্য অ্যান্টিমনোপলি সংস্থা এসব ধরে প্রচুর জরিমানা করে। ইতিমধ্যে ডলারের দাম কমবেশি স্ট্যাবল হওয়ায় জিনিসপত্র দোকানে ফিরে এসেছে। তবে এটা ঠিক হাইটেকের অনেক জিনিসপত্রের অভাব দেখা দেবার সম্ভাবনা আছে কিছুদিন পরে যখন স্টক শেষ হয়ে যাবে। আমার মনে আছে সোভিয়েত আমলে এদেশে কম্পিউটার আমদানির উপর বিদেশী নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা তখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এসব দেশ থেকে কম্পিউটার কিনে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিক্রি করত। তাই আমার ধারণা চীন বাদেও অন্যান্য অনেক দেশের মাধ্যমে সেই সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে। তাছাড়া মনে রাখতে হবে পুঁজিবাদ লাভ খোঁজে, তাই স্যাঙ্কশনের ফাঁদে পড়ে সরাসরি এদেশে বিভিন্ন জিনিস রপ্তানি বন্ধ করলেও তারা অলিগলি খুঁজবে। ইতিমধ্যেই ইরানের তেলের সাথে রাশিয়ার তেল মিশিয়ে নাকি বিক্রি হচ্ছে। রাশিয়া এক বিশাল মার্কেট। সেসব কোম্পানি চলে যাচ্ছে সেসব জায়গা ফাঁকা থাকবে না। ইতিমধ্যে প্রায় হাজার খানেক কোম্পানি যারা রাশিয়া থেকে চলে গেছে সেই স্থান দখল করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অনেক দেশি কোম্পানি এত দিন বিদেশী কোম্পানির সাথে পাল্লায় হেরে যাচ্ছিল, হেরে যাচ্ছিল চীনের বিভিন্ন কোম্পানি। এখন এরা সেই জায়গা দখল করবে। তবে রুশ ক্রেতা এখন যেহেতু ভাল জিনিসের কদর বোঝে তাই এসব কোম্পানিকে বাধ্য হয়েই নিজেদের প্রোডাক্টের কোয়ালিটি উন্নত করতে হবে।
ইতিমধ্যে স্যাঙ্কশনের ফলে দেশে যাতে কোন পণ্যের অভাব না হয় সে জন্যে সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। এটাকে এরা বলে আমদানি বিকল্প। আশির দশকের পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্তের মতই এই ইম্পরতোজামেশেনিয়ে বা আমদানি বিকল্প বর্তমান রাশিয়ায় প্রচণ্ড জনপ্রিয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ২০১৪ সাল থেকেই যখন পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উপর বিভিন্ন স্যাঙ্কশন আরোপের হুমকি দিচ্ছিল তখন থেকেই এখানে শুরু হয় স্বনির্ভর হবার প্রক্রিয়া। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সমস্ত কলকারখানা যখন রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেওয়া হয় তখন সেই প্রাইভেটাইজেশনের একটাই লক্ষ্য ছিল এদেশের শিল্প চিরতরে ধ্বংস করা। সেই প্রক্রিয়ার পরিচালক আনাতলি চুবাইস, যিনি কিছুদিন আগে পর্যন্তও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদে নিযুক্ত ছিলেন আর যুদ্ধ শুরুর পর পর দেশ ত্যাগ করে চলে যান, বলেছিলেন, “আমাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সোভিয়েত সমাজ, তার শিল্প – সব কিছু ধ্বংস করে ফেলা যাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর কোন দিন পুনর্জন্ম নিতে না পারে।” এর ফল হিসেবে আমরা দেখেছি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এরা বিদেশী জিনিসের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে এখানে শুরু হয় নতুন করে সব কিছু ভেবে দেখা। আর এর সূত্র ধরে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত শস্যের জন্য বিদেশের উপর নির্ভরশীল রাশিয়া আজ অন্যতম প্রধান শস্য রপ্তানিকারক দেশ। সোভিয়েত আমলের শক্তিশালী বিভিন্ন জীবানু ও ভাইরাস রিসার্চ সেন্টার নতুন উদ্যোগে কাজকর্ম শুরু। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত এসব ইনস্টিটিউট থেকে পৃথিবী পায় করোনার প্রথম ভ্যাক্সিন। বিমান তৈরিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থান ছিল আমেরিকার পরে। কিন্তু নতুন রাশিয়ায় সেটা ধ্বংস হয়ে যায়। ২০১৪ সালের পর থেকেই শুরু হয় নতুন করে বিমান উৎপাদন। বর্তমানে রাশিয়ার সিভিল এয়ার পার্কের প্রায় অর্ধেক বোয়িং আর এয়ারবাসের দখলে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পরে তারা এসব বিমানের লিজিং স্থগিত রাখে। ফলে প্রায় এক হাজার বিমান এখন মাটিতে বেকার জীবন যাপন করছে। কিন্তু এম্বারগোর ফলে এদের নিজ নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারছে না। ফলে পশ্চিমা অনেক লিজিং কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবার পথে। এদিকে এই সমস্যা সমাধানে রাশিয়া নিজেই বিমান তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে সময় লাগবে, তবে সেটা ভবিষ্যতে যেকোনো স্যাঙ্কশনের হাত থেকে বাঁচাবে। এদেশে তৈরি হবে নতুন কর্মস্থান, বিমান নির্মাণের মত সাবজেক্টগুলো আবার ফিরে আসবে এদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। তবে এসব যে খুব সহজে হবে তা কিন্তু নয়। যদিও সোভিয়েত আমলে এদেশে প্রায় সব ধরণের ফসলের সিলেকশন হত, দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশ থেকে কম পয়সায় আমদানির কারণে এখানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত এদের আগামী সিজনের জন্য বীজ সংরক্ষিত আছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বছর দুয়েক পরে সমস্যার পড়তে হতে পারে। চীন, ভারত – এসব দিতে পারে, তবে এরা এখন থেকেই চাইছে জীন পুলের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে। এক কথায় যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক – সব ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাচ্ছে। রুশরা বলে শান্তি ছিল না অশান্তি সাহায্য করল। অনেক দিন যাবত ব্যবসা বিশেষ করে মধ্যমানের পুঁজির জন্য বেশ কিছু জরুরি আইন এদের সংসদ বা দুমায় পড়ে ছিল, এখন সেগুলো পাশ হয়ে গেছে।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি ২৯ এপ্রিল ২০২২ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল
https://www.ajkerpatrika.com/182962/%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%A7%E0%A7%81-%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BF-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%9D%E0%A6%BE-%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%A8%E0%A6%BE

No comments:
Post a Comment