ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু
বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরির খোঁজ পাওয়া
গেছে। এ নিয়ে আগেও কথা হয়েছে, তবে এই প্রথম এদের বিভিন্ন দলিল রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের
হাতে এল। আমেরিকার আন্ডার স্টেট সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড সেটা স্বীকারও করেছেন।
এখানে বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল অস্ত্র তৈরির পরীক্ষা হত বলে রাশিয়া ও চীন অভিযোগ করছে।
আমেরিকা আপাতত সেটা স্বীকার করছে না। কিন্তু জর্জিয়ায়
অনেকের অকস্মাৎ মৃত্যু, দাগিস্তানে বিরল প্রাণীদের দল বেঁধে মৃত্যু
এসব পরোক্ষ ভাবে প্রমাণ করে যে ঐসব ল্যাবরেটরিতে এমন কিছু জীবানু তৈরি হত যা পাখির
মাধ্যমে ছড়ানো যায়। ইদানীং পাওয়া কিছু তথ্য বলছে ইউক্রেন তুরস্কের কাছে এমন কিছু ড্রোন
অর্ডার দিতে চেয়েছিল যা ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্প্রে ছড়াতে পারে। উল্লেখ্য যে ইউক্রেন, জর্জিয়া, কাজাখস্তান সহ
অন্যান্য এক্স-সোভিয়েত
রিপাবলিকগুলোয় এমন অনেক ল্যাবরেটরি আছে যা আমেরিকান বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পেন্টাগনের
অর্থ সহায়তায় চালিত। ইউক্রেন সহ বিভিন্ন দেশে এ ধরণের ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠিত হয় খুব
সম্ভব ২০০৫ সালে তৎকালীন সিনেটর বারাক ওবামার অংশগ্রহণে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ওবামা
আমেরিকা বা পার্শ্ববর্তী কোন দেশে এ ধরণের ল্যাবরেটরি স্থাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ
করেন। এটাও পরোক্ষ ভাবে প্রমাণ করে যে এসব ল্যাবরেটরিতে এমন সব পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো
হত যেটা নিরাপদ ছিল না। রাশিয়া ও চীনের চারিদিকে
বিভিন্ন সামরিক ঘাটির পাশাপাশি এ ধরণের ল্যাবরেটরির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আজ হোক
আর কাল হোক এই সংঘাত ছিল অবশ্যম্ভাবী। তবে তখন সেটা হত আরও কঠিন যুদ্ধ, অনেক বেশি ক্ষয়
ক্ষতির কারণ। আজ যারা রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার তারা যদি একই ভাবে
ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া সহ বিভিন্ন
দেশে আমেরিকার আগ্রাসনের বিপক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতেন, দেশে দেশে রঙ বেরঙের বিপ্লবের বিরুদ্ধে
কথা বলতেন পৃথিবী আজ এই মানবিক বিপর্যয়ের
দ্বারে এসে দাঁড়াত না। উল্লেখ করা
যেতে পারে যে
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়
হান্টার বাইডেন এসব
ল্যাবরেটরির সাথে জড়িত
ছিলেন। যখন ইউক্রেনে এসব ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয় তখন
সে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন আমেরিকান নাগরিক উলিয়ানা সুপ্রুম যার পিতামহ স্তেপান বান্দেরার সহযোগী ছিলেন। উল্লেখ্য যে বিদেশী নাগরিকের মন্ত্রী হবার ব্যাপারে ইউক্রেনে
সাংবিধানিক বাধানিষেধ থাকার পরেও সুপ্রুম নিয়োগ পান। এটা আবার প্রমাণ করে ইউক্রেনের
আসল শাসক কারা। বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে হান্টার বাইডেন আলোচনায় আসে। তার
ল্যাপটপ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
তখন আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম একে রাশিয়ার চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দেয়। তবে সাম্প্রতিক কালে তারা স্বীকার করেছে যে ল্যাপটপের ঘটনায় রাশিয়া জড়িত
ছিল না। কিছু কিছু ডকুমেন্ট
প্রমাণ করে যে জো বাইডেন শুধু হান্টারের পিতাই নন, বিজনেস পার্টনারও বটে, অন্তত তিনি
ছেলের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেতেন। তাই সেখানে আমেরিকার রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পাশাপাশি
যে বাইডেন ফ্যামিলির স্বার্থও জড়িত এটা বলা অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া অ্যান্থনি ব্লিনকিন,
ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড – এদের শিকড় ইউক্রেনের ওদেসায়। এই দুই পরিবারই কয়েক প্রজন্ম আগে
জারের রাশিয়া থেকে আমেরিকায় যায় ভাগ্যের সন্ধানে। তাই এদের মধ্যেও যে অন্ধ রুশ বিরোধিতা
নেই সেটাই বা কে জানে?
বাচ্চারা যখন ছোট ছিলতখন একটা
জিনিস খেয়াল করতাম।
অনেক সময় ওরা
অপেক্ষা করত ছোট
ভাই বা বোন কখন
আঘাত পেয়ে কাঁদবে, তারপর ওকে কোলে
নিয়ে সান্ত্বনা দেবে। যদিও চাইলে আগেই
ওরা বাচ্চাটা যাতে
আঘাত না পায়
সেটা করতে পারত, যা সাধারণত বড়রা
করে। মনে হয়
প্রথমত কিউরিওসিটি থেকে – দেখি কী
হয় পড়ে কি পড়ে
না। আবার যদি আগে
থেকেই ব্যবস্থা নিত
তাহলে বাহবা পাবার উপায় ছিল না, কিন্তু ক্রন্দনরত বাচ্চাকে সান্ত্বনা দিয়ে
বাবা মার কাছ
থেকে প্রশংসা পাওয়া যায়। আজ রাশিয়া যদি ইউক্রেন দনবাসে তাণ্ডব চালানোর পরে
সেখানে আসত, হয়তো
এতটা সমালোচনার মুখে
পড়ত না, বরং
অনেকের কাছ থেকে
বাহবা পেত যেমন
হয়েছে সিরিয়ায়, কিন্তু আমরা কি এ
জন্যে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষের জীবন
বলিদান করতে প্রস্তুত? মনে হয় তাই।
আমরা আমাদের কাজের যুক্তি খুঁজি কোন
ঘটনা ঘটার পরে, কেন ঘটল সেটা
প্রায়ই বিবেচনায় না
এনে।
মানুষের চরিত্রই এমন
যে কেউ বিপদে পড়লে
সে তাকে সাহায্যের হাত
বাড়িয়ে দেবে না, কিন্তু যখন
সেই বিপদগ্রস্থ মানুষ মারা
যাবে তখন তার
প্রতি সমবেদনার অন্ত
থাকবে না। কিন্তু সেই একই লোক
যদি জীবন বাঁচাতে অন্যায় কিছু করে তখন
সবাই মিলে তাকে
অপরাধী সাজিয়ে ছাড়বে। আর এটা সে
করে সব সময় শুধু
খণ্ড চিত্র বিবেচনায় আনে বলে। যেকোনো বিষয়ে কমবেশি নিরপেক্ষ ও সঠিক সিদ্ধান্তে আসার জন্য দরকার পূর্ণ চিত্র বিবেচনা করা। বর্তমান পৃথিবী এত বেশি স্বার্থান্ধ যে সে কাউকে পূর্ণ চিত্র দেখতে শেখায় না। সবাই
দেখায় শুধু সেই
চিত্রটাই, অনেক সময়
ফেইক চিত্র, যেটা
তার স্বার্থ উদ্ধার করবে। এখন সত্য
খোঁজা হয় না, যে ভাষ্য স্বার্থ উদ্ধার করতে সাহায্য করে সেটাকেই ছলে
বলে কৌশলে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সব
রকম চেষ্টা করা
হয়। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে তাই প্রতিষ্ঠিত অনেক
আইন কানুন আজ কাজ
করে না, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতার সাথে
সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও
সামাজিক চুক্তি এখনও
তৈরি হয়নি। এর
ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে শূন্যতা তৈরি
হয়েছে তা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও
জটিল করে তুলেছে।
অনেককেই বলতে শুনি
দনবাসে যেহেতু যুদ্ধ চলছে তাহলে রুশ
আক্রমণ এখানে সীমাবদ্ধ রাখলেই তো হত।
এখানে হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের কথা
মনে করিয়ে দিতে চাই।
জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার আগে
সমস্ত ইউরোপ পদানত করে। আর এসব
দেশগুলো প্রায় বিনা
প্রতিরোধে জার্মানির অধীনতা মেনে নেয়। ফলে
সেসব দেশে পারত
পক্ষে ফ্যাসিস্ট শাসন
কায়েম হয়। এসব
দেশের সৈন্যরা জার্মান সৈন্যের সাথে হাতে
হাত মিলিয়ে আসে
সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল
করতে। পরাজিত জার্মান বাহিনী যখন পিছু
হটতে শুরু করে
তখন প্রশ্ন আসে
সোভিয়েত সীমান্ত ত্যাগ করার পর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হবে
কি হবে না। যদি
সেটা না হত
বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদের সমর্থনকারী সরকার ক্ষমতায় থাকত। এমনকি কয়েক বছরের মধ্যেই জার্মানি নতুন করে
শক্তি সংগ্রহ করে
যুদ্ধ শুরু করত।
তাই সে সময় ইউরোপকে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে
মুক্ত করার বিকল্প ছিল না। আর
যেহেতু প্রায় প্রতিটি দেশেই যেটুকু প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তা
হয়েছিল সেসব দেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বারা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এসব এলাকা মুক্ত করেছিল স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে গড়ে উঠেছিল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখানে শুধু গায়ের জোর
ছিল না, ছিল
অবজেক্টিভ রিয়ালিটিও। উল্লেখ করা যেতে পারে
যে জেনারেল ফ্রাঙ্কো ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেন শাসন করেন। হিটলার ও মুসোলিনির মত
না হলেও তিনি এদের
চেয়ে খুব বেশি
দূরে ছিলেন না।
ফ্যাসিবাদ মুক্ত হবার
কারণেই ১৯৪৫ থেকে
৫০ বছরেরও বেশি
সময় ইউরোপ যুদ্ধ দেখেনি। সেই একই কারণে ইউক্রেন থেকে ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ আজ
যুগের দাবি। তা
না করলে অচিরেই নতুন
করে যুদ্ধ শুরু হবে
আর তা হবে আরও
ভয়ংকর। ১৯৭১ সালে
পাকিস্তান এটাই বলার
চেষ্টা করে যে
এই যুদ্ধের পেছনে ভারতের হাত আছে
আর দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরাই এ জন্যে দায়ী। ফলে একাত্তরে তারা নির্বিচারে হিন্দু নিধন
করে। সাথে ছিল
আওয়ামী লীগ আর
বামপন্থীরা। এমনকি এখন
যে জামাত হেফাজত সহ
পাকিস্তানপন্থী বিভিন্ন দল
হিন্দুদের উপর অত্যাচার করে সেটা তখনকার রাগ থেকেও। একই
ভাবে যদি ইউক্রেন থেকে ফ্যাসিবাদ সমূলে উৎপাটন না করা
হয় তাহলে সেখানকার রুশদের সেই একই রকম
বিপদের মধ্যে রাখা
হবে। কেননা এসব
ফ্যাসিবাদী দল প্রথম সুযোগেই আক্রমণ করবে
স্থানীয় রুশদের আর রুশপন্থী ইউক্রেনিয়ানদের উপর। ইতিমধ্যে সেখানে অনেকেই ডাক
দিচ্ছে রুশ হত্যার, বিশেষ করে রুশ
শিশু হত্যার যাতে
করে উত্তরসূরিরা পিতামাতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে
না পারে। মনে করিয়ে দিতে চাই যে
১৯৭১ সালের ১৬
ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, রাজাকার আলবদর নয়। শেখ
মুজিবের ডাকে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করে, রাজাকাররা নয়।
একাত্তরের বিজয়ের পরে
প্রয়োজন ছিল রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়া, দেশকে আক্ষরিক অর্থেই রাজাকার মুক্ত করা।
তখন সেটা হয়নি বলেই
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট, তখন সেটা হয়নি
বলেই আজ বাংলাদেশের নতুন করে পাকিস্তানের জুতা পরা।
ইউক্রেন যুদ্ধের আরও একটা দিক ছিল – পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
যুদ্ধের শুরুতেই অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল কী হবে এসব কেন্দ্রের। চেরনোবিলের স্মৃতি
এখনও অনেকের মনেই ভেসে ওঠে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা
করার জন্য যথেষ্ট যত্ন করেই তৈরি করা হয়েছিল, যেমন (১) ৩০ কিলো পাস্কেল শক্তির শক ওয়েভের
চাপ বহন করতে পারে। এই চাপে বিমান দুমড়ে মুচড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যায়; (২) ২০ টন ওজনের প্লেন
৭২০ কিমি/ঘন্টা বেগে এর উপর পড়লে ঠিক দাঁড়িয়ে থাকবে; (৩) ৫৬ মি/সেকেন্ড বেগের ঝড় সইতে
পারে; (৪) বন্যায় টিকে থাকতে পারে; (৫) রিখটার স্কেলের ৮ নম্বর ভুমিকম্পে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে চেরনোবিলের ঘটনা প্রমাণ করে যে ভেতর থেকে সেখানে
দুর্ঘটনা ঘটানো অসম্ভব কিছু নয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য
হল তাঁকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চালু রাখতে হয়। একটা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ
বন্ধ করলে সেখানে এমন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে যখন দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন। ইউক্রেন সেই
চেষ্টা করেছিল চেরনোবিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে, যদিও রুশ সৈন্যরা প্রথমে জেনারেটরের
সাহায্যে, পরে বেলারুশ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সে সমস্যার সমাধান করে। ইউরোপের সবচেয়ে
বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাপারোঝিয়ায় তারা প্রভোকেশন করে, যদিও রুশ সৈন্যদের সময়োপযোগী
হস্তক্ষেপে সেটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। আসলে উগ্রবাদীদের হাতে যেকোনো অস্ত্রই মানবতার
জন্য হুমকিস্বরূপ। সেই প্রমাণ তালিবান, আল কায়েদা, ইসলামিক স্টেট নিকট অতীতে বার বার দিয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যত কেন্দ্র
নিয়ে এর আগে বিস্তারিত লিখেছলাম (https://bijansahawhispers.blogspot.com/2022/03/blog-post.html)
যুদ্ধ শুরুর পরে রুশোফোবিয়া অসম্ভব রকম বেড়ে গেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে পোল্যান্ডের এক মন্ত্রী শিকার করেছে যে রুশোফোবিয়া এখন পশ্চিমা বিশ্বের মেইন স্ট্রীম আইডিয়া। আর এটা শুধু যারা রাশিয়ার নাগরিক তাদের সাথেই ঘটছে না, যারা যুগ যুগ ধরে ইউরোপ বা আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে বাস করছে – তারাও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ইউরোপ আমেরিকায় অধ্যয়নরত শত শত রুশ ছাত্রছাত্রীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দস্তইয়েফস্কি, চাইকোভস্কি – মানে রুশ সাহিত্য, রুশ মিউজিক আজ পশ্চিমা বিশ্বে নিষিদ্ধ। ভালেরি গিওরগিয়েভ, আন্না নিত্রেপকা সহ অনেক বিশ্ব বরেণ্য শিল্পী যারা ওখানে কাজ করতেন বা রেগুলার প্রোগ্রাম করতেন তাদের সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। তাদের বলা হচ্ছে হয় হয় এই আক্রমণের বিরোধিতা করতে মানে দেশদ্রোহী হতে। কিন্তু এরা তো জানে দনবাসের মানুষের কষ্টের কথা। সমস্ত খেলাধুলায় এদের অংশগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে। শত শত রসুহ ড্রাইভার আটকা পড়ে আছে পোল্যান্ড বেলারুশ সীমান্তে। এখন বাল্টিকের দেশগুলো রাশিয়া ও বেলারুশের ট্রাক ও অন্যান্য মালবাহী গাড়ি আটকিয়ে দিচ্ছে। এটা আসলে রাশিয়াকে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বই কিছু নয়। কোন কোন হাসপাতাল রুশ রুগীদের সেবা দিতে অস্বীকার করছে। আমেরিকা ও ইউরোপের কোন কোন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারগুলো এদেশের রুগীদের স্যাম্পল টেস্ট না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ এরাই নিজেদের মানবতার ধারক ও বাহক বলে ভাবে। অনেক রুশদের কাছে বাসা ভাড়া দিচ্ছে না বা যারা অনেক দিন বাসা ভাড়া করে আছে তাদের উঠে যেতে বলছে। এটা অনেকতা আমাদের সব দেশে ধর্ম দেখে বাসা ভাড়া দেয়া বা না দেয়ার মত। স্কুলের বাচ্চাদের শিক্ষক ও সহপাঠীরা মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাদের রুশ বিরোধী কাগজে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করছে। বাল্টিকের দেশগুলোয় রুশ ছাত্রছাত্রীদের ফর্ম পূরণ করতে বলা হচ্ছে যেখানে বাবা মার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য, যেমন তারা এই যুদ্ধের ব্যাপারে কোন পক্ষ সমর্থন করে, সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ইউরোপের কোন না কোন দেশে শুধু রুশ হবার অপরাধে অনেকের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ইউক্রেন থেকে অনেকেই বিভিন্ন দেশে অবসর যাপনকারী রুশ মহিলা ও শিশুদের হত্যা করার ডাক দিচ্ছে। একারণে এদেশে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে সন্ত্রাসবাদী সাইট বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মনে পড়ে ১৯৯১ সালের কথা। পোল্যান্ড দূতাবাসে গেছি ভিসার জন্য। খুব ভোরে গেছি, দূতাবাস তখনও খুলেনি। একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলে জানলাম ও পাকিস্তান থেকে। কিছুক্ষণ পরে কিছু দূরে আরেকজনকে আসতে দেখলাম। পোশাক দেখে বুঝলাম শিখ। হঠাৎ করেই পাকিস্তানি ছেলেটা ওর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। অপরাধ – ও ভারতীয়। এই দুজন লোক কোন দিন একে অন্যকে দেখেনি, কেউ কারও ক্ষতি করেনি, অথচ বিনা কারণে একজন আরেকজনের উপর হামলা চালাল। তখন অবাক হয়েছিলাম। এখন দেখছি সভ্য ইউরোপের মানুষও এ ব্যাপারে খুব একটা এগিয়ে যায়নি। আসলে কি বলব। মাত্র তিন বছরে জার্মানির শিক্ষিত, সভ্য মানুষেরা হিটলারের ডাকে বিশ্বে তাণ্ডব চালিয়েছিল। ঘৃণা করতে শেখানো খুব সহজ, কিন্তু একদিন যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে তখন কিন্তু একদিনে এই ঘৃণা চলে যাবে না। বুক ভরা ঘৃণা নিয়ে মানুষ তখন কী সমাজ গড়বে? ইতিমধ্যে রাশিয়ার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুদ্রা আটকে দেওয়া হয়েছে। এক কথায় যেভাবে পারছে এদের সম্পদ লুটপাট করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত সাড়ে ছয় হাজারের বেশি স্যাঙ্কশন আরোপ করা হয়েছে। দেশটাকে ধ্বংস করার জন্য যা যা করা দরকার সম্মিলিত পশ্চিমা বিশ্ব সেটাই করছে। করছে নিজেরাই এদের এই পর্যায়ে নিয়ে এসে। কারণ এটা তাদের অস্তিত্বের লড়াই। এখানে আমি ১৯৮৩ সাল থেকে। একটা দিনের কথাও মনে পড়ে না যখন এদের উপর একটা না একটা স্যাঙ্কশন আরোপিত ছিল না। আসলে কারও উদ্দেশ্য যদি হয় প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা সে অজুহাত খুঁজে বের করবেই। সেই নব্বুইয়ের দশকে, যখন বরিস (ইয়েলৎসিন) আর বিল (ক্লিনটন) নিজেদের বন্ধু বলে সম্বোধন করতেন তখনও সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর আরোপিত বহু স্যাঙ্কশন কাজ করত। এটা অনেকটা সেই গল্পের মত – “যখন নেকড়ে ভাঁটিতে জলপান রত ভেড়াকে খেতে চায় জল ঘোলা করার অপরাধে। ভেড়া ভাঁটিতে দাঁড়িয়ে আছে এই অজুহাত দেবার চেষ্টা করলে নেকড়ে বলে, তুই না হলে তোর দাদা নিশ্চয়ই আমার জল ঘোলা করেছিল। তাই তোকেই সে ঋণ শোধ করতে হবে।” বর্তমানে ইউরোপ আর আমেরিকায় রুশদের নিয়ে যা ঘটছে সেটা আমায় মনে করিয়ে দেয় ১১ সেপ্টেম্বরের পরের দিনগুলোর কথা যখন অনেক আমেরিকান মুসলিম নাগরিকও ডিস্ক্রিমিনেশনের শিকার হয়েছিল। যদিও ইউরোপের মাল্টি-কালচারাল আইডিয়া অনেক আগেই মৃত্যু শয্যাশায়ী ছিল, বর্তমান ঘটনা খুব সম্ভব তার জন্য শেষের ঘন্টা বাজিয়ে দিল। টলেরেন্সি বা পরমত সহিষ্ণুতা এভাবেই বেঘোরে মারা গেল। যুদ্ধে যাই ঘটুক ইউরোপ যে আর কোন দিনই আর আগের ইউরোপ থাকবে না সেটা জোরেশোরেই বলা যায়।
লেখাটি আজকের পত্রিকায় ২৬ এপ্রিল ২০২২ প্রকাশিত হয়েছে।
আলোচনায় জীবাণু অস্ত্র: গোড়াটি কোথায় (ajkerpatrika.com)

No comments:
Post a Comment