Wednesday, April 27, 2022

যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধ: মূলটি কোথায়

যুদ্ধ চলছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। না না, ভয় পাবার কিছু নেই, সেই অর্থে বিশ্বযুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি, কিন্তু সারা বিশ্ব যেভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, এই যুদ্ধের তাপ, সত্যি কথা বললে শীতল স্পর্শ, অনুভব করছে তাতে একে বিশ্বযুদ্ধ বললে ভুল বলা হবে বলে মনে হয় না। দেশে দেশে প্রায় প্রতিটি রান্না ঘরে মানুষ টের পাচ্ছে এই যুদ্ধের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ। তেল গ্যাস থেকে শুরু করে খাদ্য পর্যন্ত সবাই মিছিল করে বলছে তারাও চায় ন্যায্য মূল্য, এই ভোগবাদী বিশ্বে তারাও চায় তাদের সঠিক মূল্যায়ন।  

যদিও অনেকেই ইউক্রেনের যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পরবর্তী রাজনীতির তুলনা করাটা ভাল চোখে দেখেন না, তবুও আমার মনে হয় বর্তমান ইউক্রেনকে, এর রাজনীতি বুঝতে হলে তুলনাটা মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না, বরং ঘটনাগুলো বুঝতে সাহায্য  করবে। প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলো যেমন কিছু কিছু সমীকরণের সাধারণ সমাধান দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় আর প্রতিটি বিশেষ অবস্থা ব্যাখ্যার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ ইনিশিয়াল বাউন্ডারি কন্ডিশন আরোপ করতে হয় এখানেও তাই। সব বিশেষ সমস্যার সামাধান থাকে না, তবে সাধারণ সমাধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন সমাধান প্রাকৃতিক বিবর্তনের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না। তবে এটাও ঠিক প্রতিটি মানুষই নিজের অবস্থাটা বিশেষ ভাবে দেখতে চায়, সে নিজেকে দশজনের চেয়ে আলাদা বলে ভাবতেই তৃপ্তি বোধ করে তাই অনেকেই যে ধরণের তুলনায় বিব্রত বোধ করবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।  এখানে একটা কথা বলা দরকার যে মূল যুদ্ধটা বর্তমানে রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের হলেও এটা আসলে আমেরিকার ইউরোপিয়ান বাজার দখলের যুদ্ধ। আর সঠিক করে বলতে গেলে রাশিয়া জার্মানি যাতে একত্রিত হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে সেই পরিকল্পনার অংশ। কারণ ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমেরিকার অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন সে যদি রাশিয়া থেকে স্বল্প মূল্যে তেল গ্যাস পায় তাহলে তার পণ্য হবে বিশ্ব বাজারে আমেরিকার পণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে অন্যদিকে জার্মানির সাথে সুসম্পর্ক হলে রাশিয়া পাবে স্থিতিশীল বাজার তার তেল গ্যাসের জন্য। স্বাভাবিক ভাবেই তা সামরিক ক্ষেত্রে আমেরিকার অন্যতম শত্রু রাশিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। যদি এই দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করা যায় তাহলে এক ঢিলে দুই পাখী মারা যায়। তবে পশ্চিমা প্রোপ্যাগান্ডায় এসব নিয়ে কোন লেখা দেখা যাবে না। সেখানে আপনি পাবেন পুতিন হটাও ইউক্রেন বাঁচাও নামে এক জিহাদ। হ্যাঁ জিহাদ। কেননা সেই ৯৮৮ সালে অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন সময় পশ্চিমারা দল বেঁধে রাশিয়া আক্রমণ করেছে। নেপোলিয়ন যখন রাশিয়া আক্রমণ করে তার সাথে ছিল অধিকৃত সমগ্র ইউরোপ। একই ঘটনা ঘটেছিল হিটলারের জার্মানির রাশিয়া আক্রমণের সময়েও। এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সরাসরি অংশ না নিলেও এবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক হয়েছে সমগ্র ইউরোপ, সাথে ব্রিটেন, আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশ। যুদ্ধের বিভিন্ন কারণ নিয়ে এর আগে জ্বলদর্চি পত্রিকায়  «যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়» লিখেছি   (https://www.jaladarchi.com/2022/02/war-game-bijan-saha.html )

 

প্রায়ই যে কথাটা শোনা যায় তা হল ইউক্রেন দেশটার জন্ম কবে? ১৯৪৭ সালের আগে যেমন পাকিস্তানের অস্তিত্ব ছিল না, ঠিক তেমনি ১৯১৭ সালের আগে রুশ বিপ্লবের আগে ইউক্রেনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। তার মানে এই নয় যে সেখানে কেউ বাস করত না। হাজার হাজার বছর যাবত এখানে লোক বাস করছে। তবে নবম শতকে নভগোরাদের রাজা রিউরিক কর্তৃক কিয়েভ কেন্দ্রিক রুশের (সঠিক ভাবে বললে রুছ) জন্মের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় নতুন পথযাত্রা। কিয়েভেই এদেশ খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। এর পরে তারা ছড়িয়ে পরে বর্তমান রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। শেষ পর্যন্ত ১১৪৭ সালে রিউরিকের উত্তরসূরি ইউরি দলগোরুকির প্রতিষ্ঠিত মস্কভা বা মস্কোই সবাইকে নিজ পতাকা তলে নিয়ে আসে। এই মস্কো ও পরে সাঙ্কত পিতেরবুরগের (সেন্ট পিটারসবার্গ) জারদের হাতেই জন্ম নেয় বর্তমান ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর। রুশ সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে  ইউক্রেন পিপলস রিপাবলিক নামে এক অটনোমাস রাষ্ট্র জন্ম নেয়, তবে সে বছর ডিসেম্বর মাসেই তা নিজেকে সোভিয়েত হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯১৮ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা ঘোষণা করে, কিন্তু বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধের পর সেখানে সোভিয়েত রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্মপ্রকাশ করে। এর প্রথম অংশগ্রহণকারী প্রজাতন্ত্রগুলো হলরাশিয়া, ইউক্রেন, বেলোরুশিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া জর্জিয়া। সে সময় লেনিন রাশিয়ার এক বিশাল ভূখণ্ড ইউক্রেনে দান করেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে স্তালিন  (স্ট্যালিন) পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং রুমেনিয়ার কিছু কিছু অংশ ইউক্রেনের সাথে যোগ করেন। ১৯৫৪ সালে খ্রুশেভ (ক্রুশ্চেভ) ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্র রাশিয়া থেকে নিয়ে ইউক্রেনকে দান করেন। সোভিয়েত আমলে ক্রিমিয়া ছিল অটোনোমাস রিপাবলিক, তবে ১৯৯১ পরবর্তী সময়ে সে তার স্বাতন্ত্র্য হারায়। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছে। সেদি থেকে ক্রিমিয়া কখনই ইউক্রেনের শাসন মেনে নেয়নি। আর এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের, বিশেষ করে মস্কোর মেয়র লুঝকভের সাথে কিয়েভের নেতাদের মনোমালিন্য হয়েছে। উল্লেখ্য যে ক্রিমিয়া স খারকভ থেকে শুরু করে ওদেসা পর্যন্ত পুরো দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের ভাষা মূলত রুশ। ১৯৯১ পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী রুশ ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেবার আশ্বাস দিয়েছে আর এদের ভোটে নির্বাচনে জিতে সেটা বেমালুল ভুলে গেছে। এটা যেমন প্রো-আমেরিকান নেতাদের ক্ষেত্রে সত্যি, তেমনি সত্যি ইয়ানুকভিচের মত তথাকথিত রুশপন্থী নেতাদের জন্যেও। আর এর কারণ সোভিয়েত পরবর্তী ইউক্রেনে জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী গোষ্ঠী সমূহের সেদেশের রাজনীতিকে জিম্মি করে রাখা। এটা হয়েছে মূলত আমেরিকা ও ক্যানাডার প্রত্যক্ষ মদতে। ২০১৩ সালে আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কিয়েভে ক্ষমতার রদবদল হয়। তুরচিনভ ক্ষমতায় এসেই রুশ ভাষা পারতপক্ষে নিষিদ্ধ করে। এর ফলাফল ক্রিমিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা ও রাশিয়ার সাথে যোগদান। এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছি জ্বলদর্চি পত্রিকায়  “রাশিয়া ও ইউক্রেন – বিপর্যস্ত মানবতা”  (https://www.jaladarchi.com/2022/03/russia-ukraine-and-the-crisis-of-humanity.html)।  

 

এর পরেই শুরু হয় দনবাসের স্বাধীনতা সংগ্রাম যা আসলে ছিল স্বায়ত্ব শাসন ও রুশ ভাষাকে নিজ এলাকার মাতৃভাষা করার দাবী। উত্তরে তারা পায় আট বছর যাবত চলমান যুদ্ধ। কী পারাশেঙ্কো, কী জিলেনস্কি – এরা সবাই যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় আসে, তবে অল্প দিনের মধ্যেই নিজেদের পরিকল্পনা (যদি ধরে নেই তারা সত্যি সত্যি যুদ্ধ বন্ধ করতে চেয়েছিল, যদিও দুজনেই পরবর্তী কালে দনবাসের মানুষদের মানুষ বলে মানতে অস্বীকার করে বিভিন্ন বক্তৃতায়) থেকে সরে আসে। কারণ ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেন শাসন করেছে উগ্রবাদী রুশ বিরোধীরা। এটা অনেকটা আমাদের দেশে বিএনপির শাসনের মত যখন নেপথ্য থেকে সব কলকাঠি নাড়িয়েছে জামাত শিবির। যদিও এদের তেমন জনসমর্থন নেই তারপরেও শুধুমাত্র ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে এরা শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, সমগ্র ইউক্রেন জনগণকে জিম্মি করে রাখে। দিন দুপুরে হারিয়ে যায় ভিন্ন মত পোষণকারী সাংবাদিক, ব্লগার, আক্টিভিস্ট। ২০১৪ সালে প্রকাশ্য দিনের বেলায় ওদেসার ট্রেড ইউনিয়ন হাউসে পুড়িয়ে মারা হয় পঞ্চাশেরও বেশি মানুষকে (সরকারি হিসেবে ৪৮ )। খারকভে নিখোঁজ হয় অনেকে। খোদ কিয়েভে দিন দুপুরে নিহত হয় অনেকে। পার্লামেন্ট মেম্বাররাও এদের হাত থেকে রেহাই পায় না। এমনকি ২০১৪ সালে তারা জাপারোঝিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দখল করে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানোর হুমকি দেয়। একসময় এরা শুধু অফিস আদালত নয় এমনকি রাস্তা ঘাটে, হাট বাজারে কেউ রুশ বললে তাদের পর্যন্ত হেনস্তা করে যদিও সাধারণ মানুষ তো বটেই এমনকি পারাশেঙ্কো, জিলেন্সকি কখনই ইউক্রেন ভাষায় পারদর্শী ছিলেন না। এভাবেই শুধু দনবাসেই নয়, এমনকি খোদ ইউক্রেনে উগ্রপন্থীরা এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। অনেকেই একথা বিশ্বস করতে চান না, বলেন তাদের বন্ধুদের ফোন করে এরকম কিছু শুনতে পাননি। কিন্তু তারা ভুলে যান এমন অবস্থায় খুব কম লোকই টেলিফোনে সত্য কথা বলবে।  এটা বুঝতে চাইলে আমাদের দেশের বিভিন্ন ধরণের সংখ্যালঘুদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন – বিশেষ করে যখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকে আর তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পেছন থেকে জামাত শিবির তাণ্ডব চালায়। একবার ভয়ের সংস্কৃতি চালু করতে পারলে মানুষকে দাবিয়ে রাখা খুব কঠিন নয়। উপরের এই ঘটনাগুলো রুশ টিভির অপপ্রচার নয়। ইউক্রেন চ্যানেলে এসব দেখানো হত।   

লেখাটি আজকের পত্রিকায় ২৪ এপ্রিল ২০২২ প্রকাশিত হয়েছে। 


যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধ: মূলটি কোথায় (ajkerpatrika.com)




No comments:

Post a Comment

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...