দীর্ঘ গ্রীষ্মের ছুটির পর লোকজন যখন দক্ষিণ অঞ্চল এবং বিদেশ থেকে ফিরতে শুরু করেছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাশিয়ায় বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা।
আজ ২৮ অক্টোবর ২০২১ রেকর্ড পরিমাণ শনাক্ত – ৪০০৯৬। আজ পর্যন্ত মোট শনাক্ত হয়েছে ৮৩৯২৬৯৭ জন আর করোনা ভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে ২৩৫০৫৭ জনের। পুরোপুরি সুস্থ্য হয়েছে ৭২৭২০৫৩ জন। বর্তমানে মোট শনাক্তের দিক থেকে রাশিয়া পঞ্চম স্থানে। মোট টেস্ট ২০৭০০৬২৫২ টি। এ সংখ্যাটা শুধুই সংখ্যা। এর পেপেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের কান্না, গবেষকদের বিরামহীন প্রচেষ্টা, স্বাস্থ্য কর্মীদের নিদ্রাহীন রাত্রি, সরকারের কিছু সাফল্য আর অনেক ব্যর্থতা।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে শুধু মাত্র বিনামূল্যে ভ্যাক্সিনই দেওয়া হচ্ছে না, লোকজন যাতে ভ্যাক্সিন নিতে উতসাহী হয় সেজন্যে লটারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে এই লটারিতে ৪৯৯ জন এক লাখ রুবল করে পেয়েছে, অক্টোবরের ড্রতে ৫০০ জন পেয়েছে এক লাখ করে রুবল। বিভিন্ন হাসপাতাল বা ক্লিনিক তো বটেই, সুপার মার্কেট, স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন জনবহুল স্থানে ভ্যাক্সিন দেবার ব্যবস্থা হচ্ছে। কিন্তু লোকজনের মধ্যে আগ্রহ তেমন দেখা যাচ্ছে না। এখনও পর্যন্ত দুই ডোজ করে ভ্যাক্সিন নিয়েছে ৪৭ মিলিয়ন মানুষ যা মোট জনসংখ্যার ৩৩%। সেপ্টেম্বরে স্কুল খোলার পরেও অনেক জায়গায় সবাইকে ঘরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্যাফে, বার, সিনেমা, থিয়েটার সমস্ত জায়গায় বিভিন্ন ধরণের রেস্ট্রিকশন। ইতিমধ্যে ৩০ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কোন কোন জায়গায়, যেখানে করোনার প্রকোপ বেশি সেখানে আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে ছুটি শুরু হবে। যাতে ষাটোর্ধ লোকজন ইচ্ছে মত ঘোরাফেরা না করে সেজন্যে ৮ নভেম্বর থেকে এদের পাবলিক ট্র্যান্সপোর্টের মান্থলি স্থগিত করা হবে। হাসপাতাল, ওষুধ আর খাবারের দোকান বাদে আর সব কিছুই বন্ধ। রেস্টুরেন্ট কাজ করবে হোম ডেলিভারি সিস্টেমে। অনলাইন ডেলিভারি অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে নতুন স্ট্রেইন এওয়াই.৪.২ শনাক্ত করার পরে আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে লকডাউনের পালা।
কার জন্য ঐ ঘন্টা বাজছে? হেমিংওয়ে বলেছিলেন তোমার নিজের জন্য। ভোগবাদী সমাজে মানুষ মৃত্যুতে বিশ্বাস করে না, তাই ঐ করোনা যে তার জন্যেও দাঁড়িয়ে আছে সেটা সে ভাবেই না। রাজা যুধিষ্ঠিরের মতে প্রতিদিন চারিদিকে এত মানুষকে মরতে দেখেও মানুষ নিজের মৃত্যু নিয়ে ভাবে না সেটাই বড় আশ্চর্য। সোভিয়েত আমল হলে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করত না, অনেক আগেই হার্ড ইমিউনিটি গড়তে যত মানুষকে ভ্যাক্সিন দেওয়া দরকার সেটা দেওয়া হত। লোকজন এমনিতেই আসত। স্বাধীনতার এই এক বড় সমস্যা – লোকজন নিজের অধিকার দাবি করলেও অন্যের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে একেবারেই অনাগ্রহী। সেটা সব বিষয়েই। আমার অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে সেজন্যে আমার যে উচিৎ অন্যের অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়া আর আমি যাতে স্বাধীন ভাবে আমার ধর্ম পালন করতে পারি সেজন্যে যে দরকার অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া – এই সোজা হিসেবের কথা নাই বা বললাম। কিন্তু এটাও তো ঠিক আমি ভ্যাক্সিন না নিয়ে শুধু নিজেকেই বিপদে ফেলি না, চারপাশের অসংখ্য মানুষের জন্য বিপদ বয়ে আনি।
আজ থেকে মস্কো সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ দিনের (২৮ অক্টোবর থেকে
০৭ নভেম্বর) সবেতন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেটা করা হয়েছে যাতে মানুষ ঘরে থাকে। কিন্তু
বাস্তবে কী ঘটছে? খবরে দেখলাম এই ছুটিতে সচী এক লাখের বেশি লোকের আগমনের জন্য প্রস্তুত
হচ্ছে। অনেকেই যাচ্ছে তুরস্ক ও মিশরে। এর ফলে এক সপ্তাহের ট্যুর প্যাকেজের মূল্য ৩০
থেকে ৪০% বেড়ে হয়েছে সাড়ে চার থেকে ৫ লাখ রুবল মানে ৬ থেকে ৭ হাজার ডলার। এতে করে সরকারের
উপর চাপ আরও বাড়ছে। চাপ বাড়ছে হাসপাতাল আর স্বাস্থ্য কর্মীদের উপর। এই ছুটি দেওয়া হয়েছিল
করোনার বৃদ্ধি কমাতে, কিন্তু সেটা হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা বেশ। কেননা প্রতিবারই
এসব ছুটির পরই হু হু করে বাড়ে করোনার প্রকোপ। পকেটের পয়সা খরচ করে করোনার সাথে মোলাকাত
করার এই আগ্রহটা বেশ সংক্রামক। কে জানে এরা কবিগুরুর সেই গান থেকে উৎসাহ পায় কি না
আমি ভয় করব না ভয় করব না
দু বেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না
করোনার শুরুতে রাশিয়া বেশ ভালভাবেই সেটা মোকাবেলা করেছে, সবার আগে ভ্যাক্সিন তৈরি করেছে, অথচ যতই দিন যাচ্ছে ততই করোনার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে তারা। বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার করে মানুষ মরছে। ফলে বিগত কয়েক বছরে জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য এদের সমস্ত প্রচেষ্টা প্রায় নাই হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় অনেকেই কঠোর লকডাউনের কথা বলছে। তবে রাশিয়ায় কখনই সেটা আরোপ করা হয়নি। সারা বিশ্বের কাছে রাশিয়া টোটালিটারিয়ান স্টেট হিসেবে গণ্য হলেও করোনার ক্ষেত্রে এরা প্রচণ্ড লিবারেল। যদি সরকার এ ব্যাপারে কঠিন হত, ঘোষণা করত যেমন আগামী জানুয়ারি থেকে যারা ভ্যাক্সিন নেয়নি তাদের করোনা চিকিৎসা বিনামূল্যে হবে না, আগামী জানুয়ারি থেকে ভ্যাক্সিন দিতে হবে শুধুই পয়সার বিনিময়ে ইত্যাদি, তবে হয়তো এত দিনে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যেত। ভ্যাক্সিন না নেওয়ার ফলেই বাড়ছে মৃত্যুর হার। ইংল্যান্ডে প্রতিদিন রাশিয়ায় প্রায় দ্বিগুণ আক্রান্ত হলে মৃত্যুর সংখ্যা সে তুলনায় নগণ্য। একই কথা বলা যায় অন্যান্য উন্নত দেশের ক্ষেত্রে। গত দু বছরে করোনা মোকাবেলায় সরকার কার্পণ্য করেনি, অথচ যদি মাস্ক, ভ্যাক্সিন, লকডাউন এসব ব্যাপারে কড়া হত আজ এই অবস্থা হত না।
বর্তমানে অবস্থা যে রকম দাঁড়িয়েছে তাতে অনেকটা জনগণকে বলা হচ্ছে তোমরা নিজে দায়িত্বে নীচের বাক্যে কমা বসাও। Привить нельзя болеть. যদিও সরকার থেকেই বলা উচিৎ ছিল привить, нельзя болеть. কারণ привить нельзя, болеть. এমন কথা বলার লোকজনের অভাব সমাজে নেই। শেষ খবর অনুযায়ী মস্কো সহ সারা দেশের ভ্যাক্সিন নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। ইতিমধ্যে করোনা প্রতিরোধে রাশিয়ায় রেকর্ড সংখ্যক ২৯০ হাজার বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু এখন সব কিছু নির্ভর করছে জনগণের সচেতনতার উপরে। কে জানে, সরকারি কাজকর্মে খুব বেশি প্রতিবাদ করতে না পেরে মানুষ এভাবেই প্রতিবাদ করছে কি না? আজ পর্যন্ত কারেলিয়া আর কালমিকি বাদে আর কোথাও অবস্থার উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই ভয় পাচ্ছে করোনা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নতুন বছর পর্যন্ত না গড়ায়। তা হলে সেটা মধ্যবিত্ত ও ছোট ব্যবসায়ীদের কফিনে নতুন পেরেক গাড়ার মত হতে পারে বলে অনেকের বিশ্বাস। সরকার সাহায্য করছে, তবে সেটা অপ্রতুল। ছোট বিজনেসের পক্ষে কর্মচারীদের এমনি এমনি বেতন দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। সেই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে গত দুই সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪ হাজারের বেশি, আর গত সপ্তাহে ৪০ হাজারের মত করে। প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আজ সেটা ১১৭৮ – যেটা নতুন রেকর্ড। তাই সরকার দ্রুত কিছু কঠিন ব্যবস্থা না নিলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তাই ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িকতার মত করোনার কালো থাবা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের চাই সেই শিক্ষা ব্যবস্থা যা মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করবে, ব্যক্তি স্বার্থের পাশাপাশি সমষ্টির স্বার্থের কথাও ভাবতে শেখাবে। হয়তো এটা হবে পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ে এক গণতান্ত্রিক পথ।
No comments:
Post a Comment