১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ রাশিয়ার অষ্টম পার্লামেন্ট নির্বাচন হল। কিছুদিন আগে এ নিয়ে লিখেছিলাম। তাই আজ মূলত লেখাটি সীমাবদ্ধ থাকবে নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে। এবারের নির্বাচন হচ্ছে নতুন পরিস্থিতিতে। গত বছর রাশিয়ার সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তনের পরে পার্লামেন্ট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। আগে এ দেশের মূল ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল প্রেসিডেন্ট আর মন্ত্রীসভার হাতে। পার্লামেন্ট ছিল আইন প্রণয়নের মূল সংস্থা। এদেশের পার্লামেন্ট ভারতের লোক সভার মত জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়। এছাড়াও আছে ফেডারেল কাউন্সিল যা অনেকটা ভারতের রাজ্য সভার মত বিভিন্ন স্টেটের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। সেক্ষেত্রে গুরুত্বের দিক থেকে পার্লামেন্ট চতুর্থ স্থানে। এতদিন পর্যন্ত আইন প্রণয়নের বাইরেও পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রস্তাবিত মন্ত্রীসভা অনুমোদন করা বা না করার ক্ষমতা রাখত। ৯০ এর দশকে যেখানে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল কমিউনিস্ট পার্টি তখন প্রায়ই পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিত। ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতা নেবার পর থেকে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। তাঁর সমর্থিত দল বরাবরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের কনফ্রন্টেশন আজ অতীত কাহিনী। এজন্যে অনেকেই বর্তমান পার্লামেন্টকে পুতিনের পকেট পার্লামেন্ট বলে মনে করে। আসলে ঘটনা হল প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিন ইয়েলৎসিনের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় আর সেই জনপ্রিয়তার উপর ভিত্তি করে তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠন করা। বিশেষ করে ২০০৭ সালে যখন পুতিন মিউনিখে পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সমান অধিকার দাবী করেন তখন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি বিরূপ কিন্তু সোভিয়েত অতীতে গর্ব বোধ করেন এমন অনেকেই তাঁর মধ্যে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ দেখেন। অবশ্য এর মধ্যে চেচনিয়ায় যুদ্ধ সমাপন করে পুতিন ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করতে সমর্থ হন।
এই প্রথম পার্লামেন্ট শুধু মন্ত্রীসভার অনুমোদনই দেবে না, পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল মন্ত্রীসভার নাম প্রস্তাবও করবে। আর সে কারণেই প্রথমবারের মত পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেরগেই লাভরভ, ডিফেন্স মিনিস্টার সেরগেই শইগু যারা এতদিন পর্যন্ত সরাসরি প্রেসিডেন্ট দ্বারা নিযুক্ত হতেন – পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছেন। সেদিক থেকে দেখলে ফরমালি হলেও বর্তমান পার্লামেন্ট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হবে। একই সাথে কমবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা। অনেকের ধারণা ২০২৪ সালে পুতিন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন না করলে শক্তিশালী পার্লামেন্টের মাধ্যমে এদেশের রাজনীতিতে নিজের প্রভাব বজায় রাখবেন।
যদিও পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রেখেছে তবুও ২০১৬ সালের তুলনায় তাদের সমর্থন ৫৪.২ থেকে কমে ৪৯.৮৩ শতাংশ হয়েছে। পক্ষান্তরে কমিউনিস্টদের সমর্থন ১৩.৩৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮.৯৪ শতাংশ। তুলনামুলক ভাবে খারাপ করেছে ঝিরিনভস্কির লিবারেল ডেমক্র্যাট পার্টি। ২০১৬ সালের ১৩.১৪ থেকে নেমে সেটা হয়েছে ৭.৫১। অন্যদিকে মিরনভের ন্যায্য রাশিয়া ৬.২২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭.৪৭। এবার এই চারটি পার্টির
বাইরে “নতুন মানুষ” নামে আরও একটা দল পার্লামেন্টে এসেছে ৫.৩৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে। ২০১৬
সালে ৭৪ টির জায়গায় এবার ৩২ টি দল নির্বাচনে
অংশ নিয়েছিল তবে পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য মিনিমাম ৩% ব্যারিয়ার আর কোন দল পাড় হতে পারেনি। ২.৪৬% ভোট পেয়ে
অল্পের জন্য মিস করেছে পেনশনভোগীদের দল। যে সমস্ত দল ৩% ব্যারিয়ার পাড়ি দিতে পারেনি
তাদের ১০.৯৫ শতাংশ ভোট আনুপাতিক হারে পার্লামেন্ট পার্টিগুলোর মধ্যে বন্টিত হয়েছে।
৪৫০ আসনের এদেশের পার্লামেন্টে
২২৫ আসন ভোটের আনুপাতিক হারে বিভিন্ন দলের মধ্যে বন্টিত হয়। বাকী ২২৫ আসনে হয় সরাসরি
নির্বাচন। ফলে প্রতিটি ভোটার মিনিমাম দুটো করে ভোট দেয়, একটা
পার্টিকে আরেকটা প্রার্থীকে। ইউনাইটেড রাশিয়া ২১৭ আসনে প্রার্থী দিয়ে ১৯৮ আসনে জয়লাভ
করেছে। ফলে ৪৫০ আসনের পার্লামেন্টে তাদের সদস্য সংখ্যা ১৯৮ + ১২৬ = ৩২৪। এবার মিরনভ
জাখার প্রিলেপিনের মত জনপ্রিয় লেখকের সাথে নির্বাচনী সমঝোতায় আসায় ধারণা করা গিয়েছিল
তারা আরও ভাল করবে। অন্য দিকে পেনশনের বয়স সীমা বাড়ানোর মত অজনপ্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ
করায় পুতিনের দল সমর্থন হারাবে বলে ধারণা করা গিয়েছিল। বিশেষ করে অন্যান্য দলগুলো পেনশনের
বয়সীমা কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এছাড়াও করোনার বিরুদ্ধে
সবার আগে ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও প্রথম দিকে করোনা মোকাবিলায় যথেষ্ট এফেক্টিভ
হলেও পরবর্তী পর্যায়ে ব্যাপক মৃত্যু ইউনাইটেড রাশিয়ার জনপ্রিয়তা কমাবে বলে ধারণা করা
গিয়েছিল। যদিও ২০১৬ সালের তুলনায় জনপ্রিয়তা কমেছে সেটা ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারবে বলে
মনে হয় না। রাশিয়ার মোট ৮৫ টি প্রসাশনিক এলাকার মধ্যে ৭ টিতে অনলাইন ভোটের কারণেই কিনা কে জানে,
এবার ভোটের সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় কিছুটা বেশি। এটা ক্রমাগত নিম্নগামী ভোট কাস্টের
ক্ষেত্রে ভালো লক্ষণ। ইলেকশন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী একবিংশ শতাব্দীতে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট
নির্বাচনগুলোতে প্রদত্ত ভোটের পরিমাণ মিলিয়ন ও শতকরা হিসেবে নিম্নরূপঃ ২০০৩ (৬০.৭; ৫৫.৭%); ২০০৭ (৬৯.৬; ৬৩.৮%); ২০১১ (৬৫.৮; ৬০.২%); ২০১৬ (৫২.৭; ৪৭.৯%) এবং ২০২১ (৫৩.৩; ৫১.৭%)। উপরোক্ত পাঁচটি দল বাদেও জন্মভূমি, সিভিল প্ল্যাটফর্ম
ও বৃদ্ধি দলের একজন করে এবং পাঁচ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।
তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব ধরেই নিয়েছে এখানে কারচুপি ছাড়া নির্বাচন হতে পারে না। পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা
উল্টো পুতিনকে জনপ্রিয় করেছে। নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপারে কেউই সঠিক তথ্য দিতে পারবে না, কেননা সারা বিশ্বের সমস্ত নির্বাচনকেই আজ প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়েছে। তবে এটা বলা যায় নির্বাচন কমিশন সমস্ত অভিযোগ যাচাই করে দেখছে। কিন্তু সমস্যা হল একদল লোক যেমন নির্বাচনে কারচুপি হবেই সেটা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে আরেক দল করে উল্টোটা। যতদিন না আমরা নিজেদের যেকোনো ধরণের অন্ধ বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব ততদিন এসব হবেই। তবে যেটা অনেকটা আস্থার সাথে বলা যায় তা হল অদূর ভবিষ্যতে রাশিয়ার বৈদেশিক ও আভ্যন্তরীণ নীতিতে ড্রামাটিক কোন পরিবর্তন ঘটবে না।
লেখাটি ০২ অক্টোবর ২০২১ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে
https://www.ajkerpatrika.com/45886

No comments:
Post a Comment