Thursday, September 16, 2021

রাশিয়ার ভোট

 

প্রায় তিন সপ্তাহ ভোলগা তীরের বিভিন্ন শহর ঘুরে দুবনা ফিরলাম। এর মধ্যে বলতে গেলে টিভি দেখা বা খবর শোনা হয়নি। যদিও আমি বিভিন্ন দেশের খবর নিই ইন্টারনেট থেকে, এদেশের খবর একই সাথে টিভি থেকেও জানার চেষ্টা করি। 

আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার পার্লামেন্ট ইলেকশন। এদেশের অর্ধেকের বেশি বড় বড় শহর ঘুরে
মাঝে মধ্যে দু একটা পোস্টার বাদে আর কিছুই চোখে পড়ল না যা কিনা আসন্ন নির্বাচনের আভাস দেয়। আমার সাথী দিলীপ ব্যানার্জি, যিনি নিজে একজন সাংবাদিক, বুঝতেই পারেননি যে এখানে একটা ইলেকশন হবে। অথচ বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া অন্যতম প্রধান  একটা দেশ। মিটিং বা মিছিলের অস্তিত্ব ছিল না কোথাও। লোকজনও জটলা করে এ নিয়ে আলোচনা করছিল না। সারা বছর যেমন, তেমনই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চারিদিকে। সবাই নিজ নিজ কাজ কর্মে ব্যস্ত। শুধু বাসায় ফিরে দেখি টিভিতে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে তাদের সমর্থন করার আহ্বান জানাচ্ছে নেতারা।

ইতিমধ্যে অগ্রিম ভোট নেওয়া শুরু হয়েছে। যে সমস্ত এলাকায় যাওয়া কষ্ট সাপেক্ষ,
যেমন সাইবেরিয়ার আর উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় যেখানে হাতে গোনা কয়েকজন লোক এখন হরিণ বা অনান্য পশু চড়াচ্ছে বা পোলার স্টেশনে আছে, হেলিকপ্টারে করে তাদের কাছে ব্যালট পেপার ও বাক্স নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা করছে ইলেকশন কমিশন। তবে এটা নতুন কিছু নয়। এ দেশে প্রত্যন্ত এলাকার লোকদের জন্য এটা বরাবরই করা হয়। তাছাড়া যারা অসুস্থ, হাসপাতালে আছে বা বাড়িতে শয্যাশায়ী তাদের জন্যেও আছে আগাম ভোট দেবার ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট এলাকায় নিযুক্ত নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন সদস্য এসব লোকের কাছে যায় ব্যালট পেপার আর বাক্স নিয়ে। সেখানে তারা ভোট দেন। ভোট গননা করা হয় অন্যান্য ভোটের সাথে একই দিনে।

 
মানুষ যাতে ভিড় না করে ভোট দিতে পারে এবার ভোট হবে তিন দিন। আর যদি কেউ ভোট কেন্দ্রে যেতে না চায় সে
ভোট দেবে অনলাইনে। এ জন্যে ১৩ সেপ্টেম্বর মধ্য রাতের আগেই অনলাইনে আপ্লিকেশন করতে হবে। তারপরেও লোকজনকে ভোট দিতে আগ্রহী করার জন্য আছে বিভিন্ন লটারি। সেখানে গাড়ি সহ বিভিন্ন পুরস্কার থাকবে। আর ভোটের দিন কেন্দ্রে তো যাকে বলে মেলা মেলা ভাব। কিন্তু এই যে এত আয়োজন, তারপরেও মানুষের ভোটের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ নেই। অনেকেই যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে যেমন এ নিয়ে খুব আলাপ আলোচনা হয়, চায়ের টেবিলে টর্নেডো ঘুরে বেড়ায় সেরকম কিছু নেই এখানে।

১৯৮৩ থেকে এ দেশে অনেক ভোট দেখেছি, তবে শুধু ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট ইলেকশন ছাড়া আর কখনও তেমন আলোচনা দেখিনি। এক সময় এখানে সবার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া যেত আর সেই প্রতিদ্বন্দ্বী যদি প্রথম বা দ্বিতীয় হত তবে ভোটের রেজাল্ট বাতিল করে নতুন নির্বাচন ডাকতে হত। যতদূর মনে আছে ভ্লাদিভস্তকে ১৩ বার নির্বাচন করেও কোন সমাধানে আসা যায়নি। এরপর ব্যালট পেপার থেকে ওটা একেবারেই উঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে দেশ ক্ষমতাশূন্য অবস্থায় না থাকে।
রাজনীতির প্রতি মানুষের উদাসীনতা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তাইতো যত বেশি সম্ভব মানুষকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার এই  প্রচেষ্টা। 

ইচ্ছে করেই এদেশে কোন পার্টির কেমন সম্ভাবনা সে কথায় যাচ্ছি না। মনে হচ্ছে দেশের কথা, যেখানে ভোট নিয়ে কত জল্পনাকল্পনা, কত আবেগ অথচ মানুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে না পেরে নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। আর এসবের ফলে মানুষের মধ্যে ভোটের প্রতি এক ধরণের অনীহা তৈরি হয়।



লেখাটি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে  


https://www.ajkerpatrika.com/32834/


 

 

Monday, September 13, 2021

ভ্যাক্সিন

 

অনেকদিন পরে ভালোদিয়ার সাথে দেখা। ও আমার ল্যাবেই কাজ করে। আমার ছবির অনুরাগী।
- ভ্যাকসিন নিয়েছ?
- না, এখনও নিইনি। আমার তো করোনা হয়েছিল, তবে ক' দিনের মধ্যেই নেব।

এ এক নতুন বাস্তবতা। কেউ আর কেমন আছ জিজ্ঞেস করে না, যেন ভ্যাকসিন ছাড়া ভাল থাকা যায় না।

- তুমি যে বেঁচে আছ তা দেখে খুব ভাল লাগছে।
আমি বুঝলাম ও আমাকে  কিছুদিন আগে মারা গেছে এমন একজনের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। আসলে আমাদের আসল পরিচয় গায়ের রঙে বা দেশের নামে। আমারও এমন হয়, অনেককে নামে চিনি, অনেককে মুখে। খুব কম মানুষকেই নামে ও মুখে চিনি। তাই কেউ মারা গেলে কত মুখ যে চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়!
- কি আর করা? কেউ বাঁচবে, কেউ মরবে। সময়ই এমন।
- কারমা (ওরা কর্মকে কারমা বলে)। ওর কারমা ছিল এখানে এভাবে মরার, তাই মরেছে।
- দেখ তোমরা অনেক কিছুর অর্থ না বুঝেই এসব বল। জান কর্ম কি?
- এটা সেই শক্তি যা আমাদের জীবনের ভালমন্দ নির্ধারণ করে, যার হাত থেকে মুক্তি নেই।
- শোন, আমি শত হলেও উপমহাদেশের লোক। কর্ম – এর মূল অর্থ হল কাজ, অ্যাকশন। জানই তো আমি কসমোলজির উপর কাজ করি। আমাদের বর্তমান বলে কিছু নেই। সেটা একটা ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত। অতীত থেকে সময় অনবরত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেই সাথে আমরাও। এই যে আমরা এখন এখানে সেটা আমাদের অ্যাকশনের ফল। আমরা অফিস থেকে হাঁটা শুরু করেছি আর তার ফলে এখানে এসেছি। এভাবে ভাবলে দেখবে আমাদের প্রতিটি বর্তমান, তথা ভবিষ্যৎ আমাদের অতীত কর্মের ফল। এটাই কর্মের মেসেজ। শুধু কিছু মানুষ অন্য ভাবে এসব ব্যাখ্যা করে সাধারণ মানুষকে ঠকায়। তাই কর্মের কথা না ভেবে মনের আনন্দে কাজ কর, নিজের কাজ  উপভোগ কর। দেখবে তাহলেই ফল আসবে।     
- আমি ২৮ বছর এসব নিয়ে পড়াশুনা করছি...।
- তুমি সারা জীবন এ নিয়ে পড়াশুনা করতে পার। যদি খোলা মনে না দেখে এসব ডগমা হিসেবে নাও, কোন লাভ হবে না। তুমি না বিজ্ঞানী! প্রশ্ন করতে শেখ। যাকগে তুমি ভ্যাকসিন নিয়েছ?
- না। আমার খুব একটা বিশ্বাস নেই আমাদের ভ্যাকসিনের উপর।
- দেখ, ভ্যাকসিন তৈরি করছে বিজ্ঞানীরা। রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস না করতে পার, কিন্তু বিজ্ঞানকে তো ফেলতে পার না।
- আমার ধারণা, আমাদের আমলারা নিজেরা বিদেশি ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের এসব দিচ্ছে।

আসলে সোভিয়েত আমলে ও পরবর্তী কালে আমলাদের উপর এমন এক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে উপর থেকে কিছু বললেই এরা সতর্ক হয়ে যায়, ভাবে আবার কোন ফন্দি আঁটছে কিনা।

- সেটা বুঝলাম, তবে এই যে এত লোক মারা যাচ্ছে সেটা তো অস্বীকার করতে পার না। তাহলে ভ্যাকসিন নিতে সমস্যা কোথায়? পরিচিত কত লোকই তো নিচ্ছে। তাদের তো সমস্যা হচ্ছে না।
- আমার মনে হয় না করোনায় এত মানুষ মারা যাচ্ছে।
- মানে?
- অন্য কোন কারণে মারা গেলেও ডাক্তাররা রিপোর্টে লেখে করোনায় মারা গেছে। তাতে ওরা এক্সট্রা পয়সা পায়।
- বল কী? আমি কিন্তু হাসপাতালে ছিলাম। ডাক্তারদের চিকিৎসার কোন ত্রুটি দেখিনি।
- আমার শ্বশুর হাসপাতালে কাজ করে। তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করে রোগীকে সাহায্য করতে। 
- তাহলে?
- সবাই তো এক রকম নয়।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। আসলে অবিশ্বাস যখন খুব গভীর হয় তখন মানুষ নিজের ভালমন্দও বোঝে না। তবে মৃত্যুর সামনে সব সাহস কর্পূরের মত উবে যায়। অনেক আগে ভ্যাকসিন বাজারে এলেও কেউ তেমন একটা গা করেনি নেওয়ার। এখন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। ভাল হত যদি বাইরের ভ্যাকসিন এখানে নিয়ে আসত। নিজেদের ভ্যাকসিন আগের মতই ফ্রি আর বাইরের ভ্যাকসিন টাকার বিনিময়ে। যাদের যেটা খুশি নিত, অন্তত তাতে ভ্যাক্সিনিটেড লোকের সংখ্যা বাড়ত।
যদিও সারাবিশ্বেই ভ্যাক্সিন আশানুরূপ কাজ করছে না, মানে আমেরিকা সহ অনেক দেশেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরির উপযোগী সংখ্যক মানুষ ভ্যাক্সিন নেবার পরেও সংক্রামণ বাড়ছে, আর জামা কাপড় বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মডেল বদলানোর মতই করোনা ভাইরাসও রূপ বদলিয়ে ভ্যাক্সিনের ফেস কন্ট্রোল এড়িয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ছে, তবুও স্বীকার করতেই হবে এখনও পর্যন্ত ভ্যাক্সিনই করোনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা। তবে ভ্যাক্সিনের সাথে সাথে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও প্রয়োজন। ভ্যাক্সিনকে করোনার বিরুদ্ধে সর্বশক্তিমান মনে করলে সেও ঈশ্বরের মতই অসহায় হয়ে পরবে। তাই ভ্যাক্সিনে বিশ্বাস রেখে ভ্যাক্সিনকে সাহায্য করতে হবে করোনার বিরুদ্ধে চলমান মুক্তি সংগ্রামে।  


লেখাটি ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে 

https://www.ajkerpatrika.com/29038/




সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...