Wednesday, August 23, 2023

জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান

অনেক দিন পরে স্বপন দা ফোন করল। আমি অফিস থেকে ফেরার পথে দোকানে ঢুকেছি। জানতে চাইল ক্রিস্টিনা কেমন আছে। ওর হার্ট সংক্রান্ত কিছু সমস্যা ছিল। তখন স্বপন দার কাছে জানতে চাইছিলাম। ভাগ্যিস দোকানে ছিলাম। তাই বললাম পরে ফোন করব। আসলে ক্রিস্টিনার সমস্যার কথা ভুলেই গেছিলাম। মাঝে এক আধ বার অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওষুধ খাচ্ছে কিনা, ডাক্তার দেখিয়েছে কিনা জানতে চেয়েছিলাম। তবে আমি নিজে যেমন ইন্টারোগেশন পছন্দ করি না, ছেলেমেয়েরাও না। ওরা যখন ছোট ছিল সাথে করে নিয়ে যেতাম ডাক্তারের কাছে। এখন ওদের নিজেদের হাত পা গজিয়েছে, তাই আমার কাঁধের দরকার তেমন নেই। তবুও স্বপন দাকে কল করার আগে ক্রিস্টিনাকে কল দিলাম। যা ভেবেছিলাম - পাওয়া যাবে না, হয় ভোকালে ক্লাসে, নয়তো এয়ারফোনে কান বন্ধ।

স্বপন দাকে ফোন করে তাই বললাম ক্রিস্টিনা অনেক দিন তেমন কোন অনুযোগ করেনি। মনে হয় ভালোই আছে। এই আমার এক সমস্যা। কেউ কিছু না বললে জিজ্ঞেস করা হয় না। যাহোক, স্বপন দা তখন একটু অবাক করে দিয়েই বলল

শোন যে জন্য তোকে ফোন করা। সুধীর দাকে নিয়ে তোর লেখাটা পড়ছিলাম। ওখানে কিছু কথা ঠিক ও রকম নয়।

এবার আমার অবাক হবার পালা। প্রথমত স্বপন দা যে লেখাগুলো পড়ে সেটাই ভাবিনি। বিশেষ করে এত বড় লেখা। দ্বিতীয়ত স্বপন দা দেশ ছেড়ে চলে গেছে আমার জন্মের পর পর। লেখাটা পুরোটাই এর পরের কাহিনী। তাই একটু অবাক হলাম।

শোন ঐ যে তুই লিখেছিস ডাকাতরা তোকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল কথাটা ঠিক নয়।

দেখ, আমার বয়স তখন ছয় মাস। ওটা পুরোটাই অন্যের মুখে শোনা। মা, দিদি, তপন দা, কল্যাণ দা, রতন সবাই তো এটাই বলত।

আসলে ঘটনাটা এরকম নয়। ডাকাতরা প্রথমে জ্যাঠামশাই এর ঘরে ঢুকে। ওখানে লোহার সিন্দুকে থাকত সব টাকা পয়সা, সোনাদানা। আর চাবি থাকতো বাবার কাছে, আমাদের ঘরে। জ্যাঠামশাই অবশ্য বাবার কথা বলেনি। ওরা তখন দরজা ভেঙ্গে আমাদের ঘরে ঢুকে। বাবা মা'কে ভয় দেখাতে থাকে। তুই শুয়ে ছিলি বিছানায়। ওরা চাবির খোঁজে তোষক উল্টাতে শুরু করে। আমার মনে হয়েছিল তুই তোষকের নীচে চাপা পড়ে যাবি। তাই ডাকাতদের বলেছিলাম। ওরা সরে গেলে আমি তোকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম। তাছাড়া আমাদের সবার বই আমি গুছিয়ে রাখতাম। চাবির খোঁজে ওরা বই এলোমেলো করতে শুরু করলে ওদের বইয়ে হাত দিতে না করেছিলাম।

তাহলে যে সবাই বলত আমাকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল?

আসলে ঘরে তখন প্রচন্ড হইচই। ওদের হাতে মশাল। তাই সবাই ওরকম ভেবেছিল। আমি কাউকে এনিয়ে কিছু বলিনি।

তাই তো দেখছি।

তাছাড়া সবার ধারণা আমি ভয় পেয়ে ইন্ডিয়া চলে আসি। ওটা ঠিক নয়। আসলে আমি অনেকটা হাবাগোবা টাইপের ছিলাম। কি হতে পারে সে ধারণা ছিল না। তাই ভয় ছিল না। আসলে তখন এক এক ক করে আমাদের কোলকাতায় পাঠাচ্ছিল লেখাপড়া করতে। ভাগু দা, দীপু দা চলে গেছে। শ্যামল দা রাজি হয়নি। তাছাড়া ডাকাতির পর পুলিশের জেরা শুরু হয়। আমি বলতে শুরু করি কে কেমন দেখতে ছিল। এতে হয়তো বাড়ির লোকেরা প্রমাদ গোনে আবার কোন সমস্যায় পড়ি কিনা। আমাকে যখন জিজ্ঞেস করল কোলকাতা যাব কিনা পড়াশুনা করতে, আমি রাজি হয়ে গেলাম।

তাই!

তাছাড়া তখন তো ভাবিনি আর দেশে ফিরব না। আমি তখন ছোট। পাসপোর্ট বা কোন ডকুমেন্ট ছিল না। কাকা রেখে আসে। এরপর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হল। যাতায়াত কঠিন হয়ে গেল। আমার কোন ডকুমেন্ট নেই। এরপর আর জি কর। নকশাল। না নাগরিকত্ব না কিছু। ফলে সরকারি চাকরি ছাড়তে হল। কারণ যখন পাসপোর্ট নিতে চাইলাম তখন ভকুমেন্ট দরকার। ভকুমেন্ট ছাড়া কিভাবে সরকারি চাকরি পেলাম সেই প্রশ্ন আসতে পারে। ইতিমধ্যে আমি বিয়ে করেছি। তোর বৌদির ভারতীয় নাগরিকত্ব ছিল। আমি ঐ সূত্র ধরে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেলাম।

আমি মনে মনে বললাম আমিও বৌয়ের লেজ ধরেই রুশ নাগরিকত্বের বৈতরণী পার হয়েছি। ইস, বৌয়ের লেজ? কখনও তো খুঁজে দেখা হয়নি। এবার দেখতে হবে।

রুশরা বলে শত বর্ষ বাঁচি, শত বর্ষ শিখি। হ্যাঁ, নিজে যখন ৬০ ছুঁই ছুঁই তখন নিজের সম্পর্কে নতুন তথ্য জানলাম। এটা ঘটেছিল আমার বয়স যখন মাত্র ৬ মাস। নিশ্চয়ই এর আগেও কিছু না কিছু ঘটেছিল, কম করে হলেও জন্ম নিয়েছিলাম (যদিও তাতে আমার কোন ক্রেডিট ছিল না), হয়তো ইতিমধ্য এক আধটা দাঁত উঠেছিল, হয়তোবা বসতেও শিখেছিলাম। তবে ওসব সবাই করে। শুধুমাত্র বিশেষ ভাগ্যবানরা ডাকাতের হাত থেকে নিজেকে ছিনিয়ে আনতে পারেন ঠিক যেমন ব্যারন মুনচাউসেন নিজে নিজেকে ডোবা থেকে টেনে তুলতে পারে। এভাবেই জীবনের সবচেয়ে পুরানো ও অন্যতম প্রধান একটা মিথ তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। কিন্তু এরকম ঘটনা জীবনে প্রথম নয়।

কসমোলজির উপর আমার গবেষণা শুরু হয় অনেকটা কাকতালীয় ভাবে। আমি যখন সাবজেক্ট চেঞ্জ করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ফিজিক্সে চলে আসি তখন এই সাবজেক্টে বাংলাদেশের ছাত্র বলতে আর কেউ ছিল না। সবাই চাইত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে। অর্থের মত না হলেও অর্থনীতির বেশ কদর ছিল। পদার্থবিজ্ঞান, গণিত - এসব ছিল দুর্ভাগাদের জন্য, যারা সাবজেক্ট চেঞ্জ করতে না পেরে এখানেই থেকে গেছে। তবে এক সময় অনেক বাংলাদেশী সুনামের সাথে এখানে পড়াশুনা করেছে। এখন একমাত্র জেরিনা আপা বাদে সবাই পিএইচডি করছেন। আমি যখন প্রথম বর্ষে অমল দা তখন পিএইচডি থিসিস ডিফেন্ড করেন। দেশে ফেরার কয়েকদিন আগে কার সাথে কাজ করা যায় সেটা জানতে চাই। তাঁর পরামর্শেই কাজ শুরু করি ইউরি পেত্রোভিচ রীবাকভের অধীনে। কাজ করি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আইনস্টাইন- ডি ব্রগ্লি- ব্যোম কনসেপ্টের উপর। এ বিষয়ে মাস্টার্স করি। কিন্তু পিএইচডির থিসিসের উপর কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি সমস্যাটা খুব জটিল। পাশাপাশি অন্য কোন বিষয়ে কাজ না করলে সময় মত থিসিস ডিফেন্ড করা হবে না। আমার ইচ্ছে ছিল সুপার সিমেট্রির উপর কাজ করার। কিন্তু ইউরি পেত্রোভিচ বললেন তাঁর এক ক্লাসমেট কসমোলজির উপর কাজ করছে। তাঁর অনেক দিনের ইচ্ছে কিছু জয়েন্ট ওয়ার্ক করার। আমি যদি চাই তাঁর সেই বন্ধু গিওর্গি নিকোলায়েভিচ শিকিনের সাথে কাজ করতে পারি। এভাবে অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই আমার কসমলোজির জগতে প্রবেশ। পরে আমি এই বিষয়ের উপর পিএইচডি ও ডিএসসি থিসিস ডিফেন্ড করি। কাজের শুরু থেকে সব সময়ই মনে একটা সন্দেহ ছিল, কি যেন একটা মিস করছি। কোথায় যেন একটা ভুল আছে। কিন্তু যতবারই শিকিনকে বলেছি তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন। ২০১০ সালে আমার এখানে একজন প্রফেসর আসেন কাজ করতে। একদিন কথায় কথায় বললেন

বিজন চল এই প্রবলেমটা নিয়ে কাজ করি।

এই বলেই একটা পেপার হাতে ধরিয়ে দিলেন। একটু দেখেই বললাম – এখানে কিছু ভুল আছে।

কেন? এ নিয়ে অনেকের অনেক কাজ আছে। আমার নিজের পেপার আছে। ভুল কেন?

গাণিতিক কিছু অসামঞ্জস্য।

তারপর কোন কথা না বাড়িয়ে নিজেই ক্যালকুলেশন করে তাঁর হাতে দিলাম। উনি একদিন সময় নিলেন। পরের দিন বললেন

তুমি যে সমীকরণের কথা বলছ সেটা প্রাথম দুই সমীকরণের লাইনিয়ার কম্বিনেশন।

হ্যাঁ, এর মানে যদি প্রথম দুটো সমীকরণের ডান দিকে কোন পরিবর্তন আনা হয় সেটা এই তৃতীয় সমীকরণের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই করতে হবে।

যাহোক, উনি বললেন এই বিষয়ে তাঁর ও তাঁর বন্ধুদের অনেকগুলো পেপার। তাই তিনি কোন চেঞ্জ না করেই সেটা প্রকাশ করবেন। আমি তাঁর মঙ্গল কামনা করলাম। কয়েকদিন পরে তিনি সেই পেপার গ্রহণের চিঠি দেখালেন। আমি বললাম

দেখুন পুশকিন বা রবীন্দ্রনাথ যদি ছন্দ ঠিক রেখেও ভুল রুশ বা বাংলায় লিখতেন সেটা কি গ্রহণযোগ্য হত? গণিত পদার্থবিদ্যার ভাষা। এখানে যদি ভুল থাকে আর সেটা যদি আপনি জানেন – তাহলে এ ধরণের পেপার প্রকাশ করা ন্যায়সঙ্গত নয়।

যাই হোক, এই ঘটনার পরে আমি ভাবতে শুরু করলাম কেন এমন হয়? আসলে প্রায় প্রতিটি বিষয়ে প্রাথমিক কাজগুলো হয় যতদূর সম্ভব সহজ উদাহরণ ব্যবহার করে। কসমলোজির প্রথম দিকের কাজে মূলত ভ্যাকিউম আর আদর্শ তরল ব্যবহার করা হত। ফলে অনেক শর্ত অটোম্যাটিক্যালি ফিট হত। কিন্তু যখনই আমরা জটিল কোন পদার্থ ব্যবহার করি আগের সেই শর্তগুলো তাৎক্ষণিক ভাবে পূরণ হয় না, সে জন্য নতুন কোন শর্ত আরোপ করতে হয়। অর্থাৎ সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধানের জন্য আমাদের সমীকরণের দু দিকটাই একই সাথে বদলাতে হবে। আইনস্টাইনের সমীকরণের বিশেষত্ব এই যে সেখানে পদার্থ যেমন স্থান-কালকে বিবর্তিত করে, স্থান-কালের বিবর্তন তেমনি পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। এর আমি নিজের পুরানো কাজগুলো নতুন করে দেখতে শুরু করলাম, দেখলাম আমাদের আগের কাজ ভুল না হলেও তার উপসংহারগুলো আংশিক ভাবে সত্য। সঠিক ফলের জন্য অন্যান্য সমীকরণ ব্যবহার করতে হবে যা সিস্টেমের উপর বিভিন্ন বাধানিষেধ আরোপ করে। শিকিনকে এটা বলায় তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন।

তাহলে কি আমি সারা জীবন যা করে এলাম সব ভুল?

না। সেটা আংশিক সত্য। সুখের খবর যে সেটা আমরা নিজেরাই ধরতে পেরেছি। আমাদের কাজই তো ক্রমশ উৎকর্ষতা লাভ করা।

কিন্তু তিনি খুব একটা খুশি হয়েছিলেন বলে মনে হয় না। আসলে প্রতিটি মানুষ, তিনি ধার্মিকই হোন আর বিজ্ঞানীই হন, এক পর্যায়ে নিজের কাজের সত্যতায় বিশ্বাস করে। যদিও বিজ্ঞানী জানে এ সত্য সাময়িক, তাকে নতুন প্রশ্ন করে নতুন উত্তর বের করতে হবে তারপরেও তিনি যে কোন ভুলের উপর ভিত্তিত করে বা আমাদের এক্ষেত্রে কিছু জিনিস এড়িয়ে যাওয়ায় একটা উপসংহারে এসেছিলেন সেজন্য নিজেকে অপরাধী মনে করছিলেন। তাই অনেক দিন কোন কিছুকে সত্য বলে জেনে হঠাৎ যদি জানতে পারি সেটা ঠিক নয় তাহলে সেটা অনেকেই গ্রহণ করতে পারে না। এটা অনেকটা কেউ আজীবন কাউকে বাবা মা জেনে এসেছে, পরে এক সময় শুনল সে আসলে দত্তক সন্তান।

স্বপন দা দেশ ছেড়ে চলে যায় আমার ছয় মাস বয়সে। তাই তখন আমাদের কথা হয়নি। শুধু গল্পে শুনেছি। প্রথমবার আমাদের দেখা হয় ১৯৬৯ সালে আমরা কোলকাতা বেড়াতে গেলে। ও তখন আর জি করে পড়ে, হোস্টেলে থাকে। তাছাড়া আমিও খুব ছোট তাই সে সময়ে আমাদের তেমন কোন কথা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। শুধু ছবি দেখে বুঝি তখন দেখা হয়েছিল। এরপর আমি কোলকাতা যাই ১৯৭২ সালে। স্বপন দা তখন নকশালের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছে। পলাতক। মা যেখানেই কোন খবর পান সেখানে ছুটে জান। সেই সাথে আমি। অন্য দিকে বহরমপুর আমার মেসতুতো ভাইও একই পথের পথিক। আর দুই বোনের এই নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। আমরা নিজেরা সাত ভাই এক বোন। মাসিমার চার ছেলে চার মেয়ে। কিন্তু যতদিন ওরা উধাও ছিল, সারা বাড়ি জুড়ে যেন ওদের অস্তিত্ব ছিল আরও অনেক বেশি করে। তাই দেখা না হলেও স্বপন দা সব সময়ই আমাদের চিন্তায় ছিল। আর আমার কাছে যতটা না ছিল বাস্তবে তারচেয়ে বেশি গল্পে। মনে আছে মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা অথবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব পশ্চিম পড়ে বার বার মনে হত স্বপন দা আর দিবস দার কথা। এরপরে ১৯৮৯ সালে যখন মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফিরি তখন কোলকাতা যাই বাবার সাথে। স্বপন দা তখন বিয়ে করেছে যদিও থাকে আর জি কর এর হোস্টেলে। কখনও কখনও ওখানেও থেকেছি। তবে সে সময় অনেক কথা হত ওর রুমমেটদের সাথে যারা ফটোগ্রাফি করত। আসলে অনেক বড় হয়ে ভাইবোনদের সাথে পরিচয় হলে সেটা অন্য রকমের হয়। যদিও দীপু দার সাথে কথা বললে দেশের অনেকের কথাই জিজ্ঞেস করে, স্বপন দা সেটা করে না। আসলে আমাদের কমন স্মৃতি খুব কম। আর মানুষের কথা বলার মূল বিষয় কমন স্মৃতি, কমন ইন্টারেস্ট বা কমন মূল্যবোধ। যদিও আমি সব সময়ই চেষ্টা করেছি বাবা মার ছোটবেলার কথা জানতে স্বপন দাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়নি। জিজ্ঞেস করা হয়নি ওর রাজনৈতিক জীবনের কথা। এমনকি ১৯৯৭ সালে পুনায় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে যোগ দেবার সময় বা ২০১৪ সালে ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভিজিটের সময় দেখা হলেও এসব নিয়ে কোন কথা হয়নি। বছর দুয়েক আগে স্বাপন দা ওর এক বন্ধু কৃষ্ণলাল সরকারের কথা বলে। আমার লেখা মনে হয় ওঁকে পড়তে দিত। পরে ফেসবুকে আলাপ। কৃষ্ণলাল দা তাঁর দাবানল আমাকে পড়তে দেন। এটাই আমার পড়া প্রথম বই যার লেখক নকশাল আন্দোলনের ভেতর থেকে সব কিছু দেখেছেন আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন। আবারও সেখানে কেন যেন মনে হয় স্বপন দার দেখা পাই। অবশ্য সেটা হয়তো আমার মনের ভুল। এভাবেই আমাদের সাথে সেই সময় যারা নকশাল করতেন বা স্বপন দার বন্ধু ছিলেন তাদের অনেকের সাথে আলাপ হয়। তাদের একজন ছিলেন অধৃষ্য দা। এরপর আলাপ হয় দিলীপ দার সাথে, দিলীপ ব্যানারজি – বিখ্যাত ফটোগ্রাফার। সে গল্প অন্য কোথাও।

বিজ্ঞানী সত্য সন্ধানী। মিথ্যার উপর ভিত্তি করে সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় না। যেহেতু নতুন নতুন তথ্য আমাদের নতুন সত্যের মুখোমুখি করে অনেক মিথ্যা তাই যতটা না আমাদের সত্য জানার অনীহা তারচেয়ে বেশি সঠিক তথ্যের অভাব। তবে একজন বিজ্ঞানী ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা বোধ করে না। এক পরিস্থিতিতে যেটা সঠিক বলে মনে হয় ভিন্ন পরিস্থিতিতে সেটা ভুল হতেই পারে। আসলে এই পরিস্থিতির ভিন্নতা সাধারণ সমস্যাকে বিশেষ সমস্যার রূপ দেয়। নতুন তথ্য বা জ্ঞান তাই শুধু সমস্যার সমাধানই দেয় না নতুন সমস্যাও তৈরি করে। এক সময় মনে হত শুধুমাত্র বিখ্যাত সব মানুষের জীবনই বিভিন্ন মিথ দিয়ে ঘেরা। এখন দেখা গেল আমার মত একজন মানুষও একটা মিথ বা মিথ্যা ধারণার উপর এতদিন বেঁচে ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হল এটা শুধু আমার একার নয়, বন্ধুদের সাথে গল্পগুজবে, বিভিন্ন লেখায় আমাকে ডাকাতদের পুড়িয়ে মারার চেষ্টা আর তাদের হাত থেকে স্বপন দার আমাকে রক্ষা করার গল্প বলেছি। এখন দেখা গেল ঘটনা ঠিক হলেও তাঁর ইন্টারপ্রিটেশনে ভুল ছিল। পুড়ে নয় তোষক চাপা পরে মরার সম্ভাবনা ছিল। আগুনে পুড়ে নাকি লেপ তোষকের নীচে দম বন্ধ হয়ে মরা ভালো সেট বলতে পারব না, আর সে বয়সে এসব বোঝার বুদ্ধি ছিল বলে মনে হয় না – তবে শেষমেশ যেটা হয়েছে সে অবস্থায় সেটাই শ্রেষ্ঠ আউটকাম – বেঁচে থাকা আর প্রায় ষাট বছর পরে সত্য জানা। পদার্থবিদ – যার কাজই সত্যের অনুসন্ধান – তার কাছে এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে?

দুবনা, ০৫ মে ২০২৩

বিঃ দ্রঃ লেখাটি ২২ আগস্ট ২০২৩ ভালভাষা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে

https://bhalobhasa.com/russiar-chirkut-part-17-by-cosmology-research-scientist-bijan-saha/

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...