Wednesday, February 1, 2023

নকল

কিছুদিন আগে সপ্তম শ্রেণীর বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তকে দু'টো প্যারাগ্রাফ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি থেকে হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে অভিযোগে অনেক লেখালেখি হয়েছে। নকল নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি নতুন নয়। এর আগেও শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোন শিক্ষকের অন্যের গবেষণা কপি করার কথা। শিক্ষা যেহেতু জাতির মেরুদণ্ড সেহেতু নকল করে শিক্ষা লাভ করলে জাতি হিসেবে আমরা মেরুদণ্ডহীন হয়ে যেতে পারি। তাই নকলের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমাদের সজাগ থাকতে হবে।

২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নেচারে একটা পেপার বেরিয়েছিল যেখানে বলা হয়েছিল হাজার হাজার গবেষক প্রতি পাঁচ দিনে একটা করে পেপার প্রকাশ করেন। যাদের পাবলিকেশনের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি এরকম কিছু বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী একাধিক পেপার কোন রকম পরিবর্তন না করে বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে হাইপারপ্রফিলিক এ সব লেখকদের ১৯% আমেরিকায় কর্মরত, এর পরে আসে জার্মানি ও জাপানের নাম। অন্য বিষয়ের কথা বলতে পারব না, তবে ইদানীং ফিজিক্সে গবেষকদের যে কোন রেসপেক্টেড জার্নালে লেখা জমা দেবার সময় লিখিত দিতে হয় যে এই গবেষণা প্লাগিয়ারিস্ম বা চুরি নয়। এমনকি কোন লেখক যদি তার পূর্ববর্তী কোন লেখার ৩০% এর বেশি রিপিট করেন তাহলে সেটাকেও নকল বা চুরি বলে ধরা হয়। ফিজিক্স সাহিত্য নয় এবং এখানে ভাষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সঠিক ভাবে গবেষণার ফলাফল অন্যদের সামনে তুলে ধরা। প্রতি মাসে বিভিন্ন স্পেসিফিক বিষয়ে শত শত পেপার লেখা হচ্ছে, অনেকেই একই বিষয়ের উপর গবেষণা করছেন। তাছাড়া শুধু নিজের কাজই নয়, অন্যদের কাজের আলোচনা করাও যেকোনো ভালো পেপারের বৈশিষ্ট্য তাই কিছু কিছু অভারল্যাপ অনিবার্য। তবে গবেষণার মৌলিকতা নির্ভর লেখকের একান্ত নিজের প্রাপ্ত ফলাফলের উপর। নতুনত্ব সেখানে অপরিহার্য। তাই মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রে নকলের ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

তবে মৌলিক গবেষণা আর টেক্সট বুক এক নয়। মৌলিক গবেষণা হল পুরানো তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন - সেটা হতে পারে পুরানো তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করা অথবা তার সংযোজন বা সংশোধন করা। টেক্সট বুকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব সহজ, সরল, প্রাঞ্জল ভাষায় শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরা হয় যাতে একদিকে যেমন সেটা শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হয়, অন্য দিকে আবার তত্ত্বের মূল বাণী বিকৃত না হয়। গবেষণা পত্র আর টেক্সট বুকের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য এক - প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করা। কিন্তু তাদের স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য ভিন্ন। তাই নকলের বিষয়টা দু’ ক্ষেত্রে দু’ রকম। নিজে কসমোলজির উপর একটা বই লিখতে গিয়ে দেখেছি স্বল্প কথায় সঠিক ভাবে কোন কিছু, বিশেষ করে পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় প্রকাশ করা কত কঠিন, বিশেষ করে বাংলা ভাষায় যখন টেরমিনোলোজি নিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

প্রশ্ন উঠেছে অধ্যাপক জাফর ইকবাল কীভাবে নকলের বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন? রেসপেক্টেবল জার্নাল থেকে নেয়া প্যারাগ্রাফ দুটোয় তত্ত্বগত দিক থেকে কোন ভুল না থাকাই স্বাভাবিক আর একজন পদার্থবিদ হিসেবে অধ্যাপক ইকবাল সেটাই দেখেছেন। নকল ধরার জন্য তিনি সেখানে নিয়োজিত হননি। যারা টেক্সট বুক নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক তুলছেন তাদের উচিত বইয়ে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য কতটুকু সঠিক ও সহজবোধ্য ভাষায় শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে সেটা দেখা। কারণ এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সঠিক ভাবে শিক্ষা দেয়া। নকল একজনের ভুল কিন্তু নকল হতে পারে সেই ভয়ে কঠিন ও দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা টেক্সট বুক লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের ভুল শেখাতে ও বোঝাতে পারে। অন্ধভাবে কারও বিরোধিতা করলে সেটা শেষ পর্যন্ত নিজের পায়ে কুড়ুলের আঘাত হানতে পারে।

দুবনা, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩

বিঃ দ্রঃ লেখাটি ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে

https://www.ajkerpatrika.com/256586/%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A6%B2

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...