Saturday, April 30, 2022

এ ছায়া যুদ্ধের আড়ালে আছে অনেক কিছুই

 

যদিও ইউক্রেনের যুদ্ধ রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর প্রক্সি যুদ্ধ তবে এখানে আরেকটা জিনিস ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না। বেশ কিছুদিন যাবত চীন বেজিং থেকে ইউরোপ পর্যন্ত সিল্ক পথের অনুরূপ এক নতুন পথ তৈরির কথা বলছে যেখানে রাশিয়া পালন করবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। আমেরিকা এই পথের বিরোধিতা করে আসছে বিভিন্ন কারণে। আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত এই বিরোধিতায় সামিল হয়েছে, ঠিক যেমনটা ইউক্রেন নর্থ স্ট্রীম এর বিরোধিতা করেছে। আমেরিকার এতে কী লাভ? এই রোড না হলে চীনের সাথে ইউরোপের যোগাযোগের মাধ্যম সমুদ্র পথ, মানে এই সমুদ্র পথেই চীন থেকে পণ্য যেত ইউরোপে। আর সেখানে আমেরিকা চাইলেই বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সেদিক থেকে এই রোড ওয়ে চীনকে ইউরোপের কাছে নিয়ে আসে, আর এতে করে চীনের উপর আমেরিকার কর্তৃত্ব শিথিল হয়। তাই ইউক্রেনের যুদ্ধ বহুমুখী।

আজ থেকে এদেশে ফরেন কারেন্সি বিক্রি অনেকটা শিথিল করা হল। এখন থেকে যে কেউ ইচ্ছে মত বিদেশী মুদ্রা কিনতে পারবে, তবে হাতে পাবে ১০ হাজার ডলার বা তার সমমানের ইউরো। বাকিটা নিতে হবে রুবলে। এছাড়া রাশান সেন্ট্রাল ব্যাংক তার বীড ২০ থেকে কমিয়ে ১৭ তে নিয়ে এসেছে। এটা অর্থনীতির ভাল অবস্থার কথাই বলে। গ্যাস থেকে বছর রাশিয়া অতিরিক্ত তিন শতাধিক বিলিয়ন ডলার আয় করবে। ইতিমধ্যে রাশিয়া ডলারের উপর তাদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনেছে। এদের ডলারের রিজার্ভের পরিমাণ মোট রিজার্ভের ৪০% থেকে ১৭% কমিয়ে এনেছে। শুধু তাই নয়, ডলার ইউরো ট্র্যাঞ্জাকশন বন্ধ করার পর এরা রুবলে তেল গ্যাস বিক্রির কথা ঘোষণা করেছে। শুধু তাই নয় চীন ভারতের সাথে এদের ট্রেড হবে ইউয়ান আর রুপিতে। এতে করে এক দিকে যেমন পশ্চিমা স্যাঙ্কশন এড়ানো যাবে অন্যদিকে তেমনি সেটা হবে ডলারের উপর বিরাট আঘাত। এটা করতে এরা ইতিমধ্যে রুবলকে গোল্ডের সাথে বেঁধে দিয়েছে। ফলে রুবল এক সময় শক্তিশালী মুদ্রা হতে পারে। মনে রাখতে হবে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ডলার ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের একমাত্র মাধ্যম। থেকে আমেরিকা বড় অংকের কমিশন পেত। এটা শুধু আমেরিকার অর্থনীতিকেই সচল রাখত না, ডলার ছিল অন্য দেশের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে দু একটা ছোট খাটো ঘটনা বাদ দিলে এতদিন পর্যন্ত ডলারের উপর বিশ্বাস হারানোর কারণ ঘটেনি। কিন্তু রাশিয়ার রিজার্ভ আটকে দেবার মধ্য দিয়ে ডলার সেই আস্থা হারিয়েছে। এখন অনেক দেশই নিজেদের ডলারের নাগপাশ থেকে বের করে আনার কথা ভাবছে। কাজটা সহজ হবে না, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাব অনেকটাই খর্ব করবে।

নব্বুইয়ের দশকে সোভিয়েত জনগণের সমস্ত উপার্জন, তার কলকারখানা, তার শিল্প, তার খনি সব কিছু যখন কিছু লোকের হাতে চলে যায়, এরাই হয়ে ওঠে এদেশের ভাগ্যবিধাতা। ইয়েলৎসিনের রাশিয়ায় তারাই ছিল সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। কথিত আছে ২০০০ সালে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পুতিন যখন এই সব ধনকুবেরদের ডেকে বলেন যে তাদের ব্যবসায় রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না, তারাও যেন রাষ্ট্রের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করে। সে সময়ের রাশিয়ার সব চেয়ে বিত্তশালী খাদারকভস্কি পুতিনকে শুনিয়ে পেছন থেকে খুব সম্ভবত পতানিনকে বলেতুমি প্রাইম মিনিস্টার হও আর আমি প্রেসিডেন্ট।একথা বিভিন্ন ইন্টারভিউয়ে সেই সময়ে সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রধান গেরাসেঙ্কো বলেছেন। এরপরই খাদারকভস্কি গ্রেফতার, ইউকস জাতীয়করণ। তবে কেসটা রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ছিল। এখানে বলে রাখি নাভালনিও কিন্তু অর্থনৈতিক কারণেই সাজাপ্রাপ্ত। বাইরের প্রোপ্যাগান্ডায় মনে হতে পারে সে প্রচণ্ড জনপ্রিয় নেতা। বাস্তব সেটা বলে না। হাতে গোনা কয়েক শতাংশ সমর্থন আছে, কিন্তু রাশিয়ার রাজনৈতিক আকাশে সে নক্ষত্র নয়, বড়জোর ছোট সাইজের উল্কা। চ্যারিস্মাটিক, তবে প্রচণ্ড রকম জাতীয়তাবাদী। পশ্চিমা প্রোজেক্ট। নাভালনির উপর বিষ প্রয়োগ নিয়ে পশ্চিমা প্রোপ্যাগান্ডা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ করে দিয়েছে। ইউক্রেনে যেমন উগ্র জাতীয়তাবাদীরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাজনীতিতে টানছিল, আনাভ্লনিও সে পথেই যাবার চেষ্টা করেছিল। তবে আমার পরিচিতদের অনেকেই যারা তার সমর্থক ছিল ওই ঘটনার পরে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।  নিয়ে  সে যাই হোক, খাদারকভস্কিকে আইনের আওতায় আনা ছিল ধনকুবেরদের প্রতি পুতিনের সিগন্যাল। যেহেতু ইয়েলৎসিনের হাত ধরেই ক্ষমতায় আসা, তিনি চেষ্টা করেছেন সেই সময়ে গৃহীত আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যারা বিত্তশালী হয়েছে তাদের দিকে চোখ বন্ধ করে থাকা, তবে একটাই শর্তেতারা রাজনৈতিক ব্যাপারে নাক গলাবে না। এর পরেও এদেশে ধনকুবেররা নির্বিঘ্নে কাজ করে গেছে। অধিকাংশই  এদেশে আয় করলেও অর্থ রেখে পশ্চিমা ব্যাংকে। তবে এই যুদ্ধের ফলে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। এর ফলে অনেকের বিশ্বাস ভবিষ্যতে রাশিয়ার রাজনীতি ধনকুবেরদের প্রভাব থেকে মুক্ত হবে। ২০১৪ সালের পর থেকেই এখানে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয় সোশ্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার। গত সামারে সাত হাজার কিলোমিটার জার্নির সময় সেটা নিজের চোখে দেখেছি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি চোখে পড়ার মত। অনেক বছর হল প্রতিটি বাচ্চার জন্ম দেবার জন্য মায়েরা ভাল অংকের অর্থ সাহায্য পাচ্ছে। অনেকেরই ধারণা এর পর থেকে দেশ আরও বেশি করে সমাজমুখী গণমুখী হবে। সেটা অবশ্যই সোভিয়েত ইউনিয়ন হবে না, তবে নব্বুইয়ের দশকে যখন সোভিয়েত অর্জনগুলো ঝেটিয়ে বিদায় করা হয়েছিল, এরপর থেকে সেই সময়ের অর্জনগুলোর অনেক কিছুই ফিরে আসবে। আমি আশাবাদী যে শিক্ষা ব্যবস্থা আবার সেই সোভিয়েত আমলের মতই হবে। সে ব্যবস্থা সারা বিশ্বেই সমাদর পেয়েছিল। এখনও ফিনল্যান্ডে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।     

গতকাল রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হল যে ইউক্রেনে আবার নতুন করে প্রভোকেশনের প্লট তৈরি হচ্ছে। এটা বুচার পাশেই কোথাও, অনেক লাশ, কিছু ফেইক আর কিছু সত্যিকারের রুশ সৈন্যদের লাশ নিয়ে যাদের ইউক্রেন আর্মি ইদানিং বন্দী অবস্থায় হত্যা করেছে। কেন এটা করছে? করছে পশ্চিমা বিশ্বের সম্মতি নিয়েই। কথা হচ্ছে দনবাস নিয়ে শেষ যুদ্ধ হবে। কারা করবে? ন্যাটোর অস্ত্র দিয়ে মূলত ইউক্রেন সেনাবাহিনী। তবে সেখানে ন্যাটোর সৈন্য যে থাকবে ছদ্মবেশে সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। গতকাল বিবিসির ইউক্রেন করেসপন্ডেন্টের তাদের অফিসের সাথে কথা বলার অডিও শোনালো এরা। সাংবাদিক বলছে যে কোন কিছুই ঘটছে না। ওদিক থেকে শোনা গেল অপেক্ষা করার জন্য, শীঘ্রই কিছু ঘটবে। এটা আমাকে মনে করিয়ে দিল যেদিন জাপারোঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গোলাগুলি চলেছিল সেদিনের কথা। সকালে কোলকাতার এক টিভি সেন্টার থেকে ফোন এলো ব্যাপারে জানার জন্য। আমি যখন বললাম ঘটনা বিস্তারিত জেনে জানাচ্ছি, ওদিক থেকে বলল, মিনিট তিনেকের ভিডিওতে আমার তথ্য পাঠাতে, তবে সেটা যেন আগ্রাসী হয়। এতেই বোঝা যায় লোকজন আজকাল আর সত্য জন্তে চায় না, চায় সেন্সেশন, চায় মেইন স্ট্রীমে যে খবর যাচ্ছে সেসবের সাপোর্টে দুটো কথা। আমি অবশ্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ভিডিও পাথিয়েছিলাম। তবে সেটা প্রচারিত হয়েছে বলে শুনিনি।                   

ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ কী হবে? নিয়েও বিভিন্ন রকম কথা হচ্ছে। রাশিয়া বলেছে তারা ইউক্রেন দখল করবে না, সে দেশের সামরিক শক্তি খর্ব আর দেশকে বান্দেরার অনুসারীদের হাত থেকে মুক্ত করাই তার মিশন। দনবাসে যুদ্ধ চলছে। জাপারোঝিয়া, খেরসনএসব এলাকায় নতুন প্রশাসন গঠিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল প্রায় সমস্ত মুক্ত এলাকায় স্থানীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতাকা উত্তোলন করছে। কেন? মনে হয় এখনও সোভিয়েত অতীতই ১৫ টি রিপাবলিকের অনেককেই এক করে। আর সোভিয়েত পতাকাই ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রতীক। রেইখস্ট্যাগের উপরে উত্তোলিত সেই লাল পতাকাই তাদের সাহস যোগায় নব্য ফাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। কিন্তু এর পরে কি? এটাই আজ তাদের জীবন মরণ প্রশ্ন। কেননা তাদের ভয়, রুশ সৈন্য যদি ইউক্রেন ছেড়ে চলে যায়বান্দেরার অনুসারীরা যারা ইউরোপে বা অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছে, আবার ফিরে আসবে আর তাদের উপর নতুন করে চালাবে অত্যাচারের ষ্টীম রোলার। কারণ তারা দেখছে বুচা বা অন্যান্য শহরে, যেখানে জনগণ রুশদের কাছ থেকে ত্রাণ সামগ্রী গ্রহণ করেছে তাদের অনেকেই রুশ সৈন্য চলে যাবার পর ইউক্রেন সৈন্যদের হাতে নিগৃহীত হয়েছে, অনেকে প্রাণও হারিয়েছে কলাবরেশনের অভিযোগে। এসব ভিডিও ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেই প্রচার করা হয়েছে। তাই এখন রাশিয়ায় নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক চলছে। তবে একটা বিষয় ঠিক। দনবাস মানে দানিয়েৎস্ক লুহানস্ক আর কখনই ইউক্রেনে ফিরবে না। একদল চাইছে খারকভ থেকে শুরু করে ওদেসা পর্যন্ত সমস্ত দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে, যেখানে রুশপন্থীরা বরাবরই শক্তিশালী, রাশিয়ার প্রতি লয়াল সরকার গঠন করা। অনেকে মনে করে সমস্ত ইউক্রেন বান্দেরা মুক্ত করে ওদের নিজেদের হাতে ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া। তবে যেহেতু উত্তর-পশ্চিম ইউক্রেন সবসময়ই রুশ বিরোধী তাই অনেকের ধারণা ওই অঞ্চল ছেড়ে দেওয়াই ভাল। তাহলে? এরকম মতও আছে যে ইউক্রেন আসলে তিন অংশে বিভক্ত হবেকিয়েভ, পলতাভাএসব অংশ নিয়ে হবে ইউক্রেন, খারকভ থেকে ওদেসা পর্যন্ত এলাকা নিয়ে হবে মালাইয়া রাশিয়া (আসলে ঐতিহাসিক ভাবেই এর অস্তিত্ব ছিল), আর লভভ, ইভান ফ্রাঙ্কো, জাকারপাতিয়াএসব যাবে পোল্যান্ডের অধীনে। তবে এখানে অন্য প্রশ্ন আসতে পারে। পোল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য বিধায় এসব অঞ্চলে ন্যাটোর ঘাটি স্থাপিত হতে পারে। এক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা কী হবে? মনে রাখতে হবে ধরেই নেওয়া হয়ছে যে রাশিয়া যুদ্ধে জিতবেই। কেন? রাশিয়ায় হারার কোন অপশন নেই। হারা মানে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে রুশ জাতি চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। হিটলার এই প্ল্যান নিয়েই এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। এই প্ল্যান থেকে পশ্চিমা বিশ্ব কখনই সরে আসেনি। আর আমেরিকার সেই অভিজ্ঞতা তো আছেই। তিন বছর আগে যেমন ইন্ডিয়ানদের রিজার্ভেশনে পাঠিয়েছিল, এখন কেন রুশদের পারবে না। অন্তত এখানকার বুদ্ধিজীবিদের একাংশ এরকম ভাবে। তাই তারা মনে করে হারার কোন প্রশ্নই আসে না, এমনকি যদি সেটা চরম মূল্যের বিনিময়েও হয়। আর সেটা পারমাণবিক যুদ্ধ। আর এই সম্ভাবনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতিদিন ইউক্রেনে নতুন নতুন অস্ত্র আসছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো থেকে। আগেই বলেছি রাশিয়াকে বিভিন্ন দিক থেকে ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনার কথা। ইতিমধ্যে বাল্টিকের দেশগুলো রাশিয়ার সাথে কালিনিনগ্রাদের সংযোগকারী স্থলপথ বন্ধ করে দিতে চাইছে। এর মানে কালিনিনগ্রাদ অবরোধ। এটা রাশিয়া ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে। জিলেনস্কি এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। আসলে সে একজন অভিনেতা, একজন অভিনেতা হিসেবে এই রোল, যখন সে যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে কথা বলতে পারে, যখন তার কথার উপর নির্ভর করে যুদ্ধ চলবে না থামবে। আর সে জানে যুদ্ধ শেষ হবার সাথে সাথেই তার অভিনয় শেষ হয়ে যাবে। তাই অনেকের ধারণা অভিনেতার সাইকোলজি আসলে দেশের মানুষের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখবেন আমেরিকা বিভিন্ন স্যাঙ্কশন আরোপ করার পরেও যেসব স্যাঙ্কশন তাদের ক্ষতি করতে পারে সেটা এড়িয়ে যাচ্ছে। সারের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউরেনিয়াম এই তালিকায় কখনই আসেনি। কিন্তু ইউরোপ সেটা করছে ভালোমন্দ কোন দিকে না তাকিয়ে। এর অর্থ ইউরোপ আত্মরক্ষার ইনস্টিঙ্কট হারিয়ে ফেলছে। আর এটাই বিপদজনক। কারণ যখন কেউ আত্মরক্ষার ইনস্টিঙ্কট হারিয়ে ফেলে সে তখন যেকোনো আত্মঘাতী কাজ করতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রধান বলেছেন তিনি ডিপ্লোম্যাসি নয়, যুদ্ধের মাঠেই এই সমস্যার সমাধান চান। ওদিকে পেন্টাগনের মুখপাত্র বলেছেন তিনি চান ইউক্রেনের মাটিতে রুশ বাহিনীর পরাজয় দেখতে। এর আগেও বাইডেন পুতিনকে খুনী বলেছে, সেদিন যুদ্ধাপরাধী বললেন। অথচ এই বাইডেনের হাত হাজার হাজার সার্ব আর আরবদের রক্তে রঞ্জিত। অবশ্য শান্তিতে নোবেল বিজয়ী বারাক ওবামার হাতেও কম খুন নেই। কিন্তু কথা হল দেশের নেতৃত্বের এ ধরণের ভাষা ডিপ্লোম্যাসির পথ বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে পুতিন নিজে বা রাশিয়ার কোন উচ্চ পদস্থ নেতা কোন দেশের কোন নেতাদের সম্বন্ধে এরকম ভাষা ব্যবহার করেননি। আসলে ইউক্রেনের এই যুদ্ধ আসলে রাশিয়ান রুলেটের মত। অনেক আগে বিসমার্ক বলেছিলেন, “আমি হাজারটা উপায় জানি রুশ ভালুককে তার গুহা থেকে বের করে আনার, কিন্তু তাকে গুহায় ফিরিয়ে নেয়ার একটা উপায়ও আমা জানা নেই।” মনে হয় এই কথা এখন আর কেউই মনে রাখে না। ফলে বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়ই যুদ্ধংদেহী স্লোগান দিচ্ছে। তবে এখানে অনেকের ধারণা পেন্টাগনে এখনও কিছু লোক আছে, যারা রাশিয়া ও আমেরিকার যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে পারে। এটাই হয়তো এবারের মত পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবে।

গত ডিসেম্বরে রাশিয়া আমেরিকার কাছে তার নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু দাবি দাওয়া পেশ করে, আমেরিকা উত্তর দেয় ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর মাধ্যমে। তখন নর্থ স্ট্রীম – ২ নিয়ে জার্মানির সাথে আমেরিকার ঝামেলা চলছিল। যুদ্ধের কয়েক দিনের মধ্যেই যখন জার্মানি কার্যত নর্থ স্ট্রীম – ২ এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল, ইউক্রেন আক্রমণ করে পুতিন বিশ্বের অন্যতম জননন্দিত নেতা থেকে জননিন্দিত ব্যক্তিতে পরিণত হলেন, দুই স্লাভিয়ান দেশের মানুষ আরও বেশি দূরে সরে গেল – আর সেটা হল আমেরিকার পক্ষ থেকে একটা গুলিও খরচ না করে। ভাবা গিয়েছিল আমেরিকা যুদ্ধটা তাড়াতাড়িই শেষ করার পদক্ষেপ নেবে। সেটা হল না। তখন যুদ্ধের পক্ষে এদেশে জনসমর্থন ছিল ৫০% এর একটু বেশি, যদিও দনবাসকে স্বীকৃতি দেবার ব্যাপারে সমর্থন আরও বেশি ছিল। কিন্তু আমেরিকা গেল উত্তেজনা বাড়ানোর পথে। তাদের ধারণা ছিল এতে মানুষ পুতিনের বিরুদ্ধে নামবে। বাইডেন এমনকি পোল্যান্ডে এসে রুশ জনগণের প্রতি সেই আহ্বানও জানালেন। ফল হল উল্টো। জনমত যুদ্ধের পক্ষেই গেল। তবে এটা ঠিক এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে এমনকি ন্যাটোর দেশগুলোতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জনগণ এক হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়ার বিপক্ষে। অনেক দিন পরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিক দল দুটো কোন কোন বিষয়ে একমত হয়, জনসন পতনের হাত থেকে রক্ষা পান। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ইউরোপের মানুষ বুঝতে পারছে তাদের সরকারগুলোর ভূমিকা। বিভিন্ন জায়গায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী মিছিল হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে রুশদের পক্ষে। ছোট, কিন্তু ছোট থেকেই তো বড় হয়। রাশিয়াকে ভাগ করাই কি পশ্চিমা বিশ্বের উদ্দেশ্য? মনে হয় না। অন্তত এখন তো নয়ই। কারণ এখন তারা রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করছে পরে চীনকে ধরবে বলে। এখন রাশিয়াকে ভাগ করলে সাইবেরিয়া যে চীনের দখলে যাবে না সে গ্যারান্টি নেই, ফলে চীন আরও শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে যদি রাশিয়া পরাজিত হয় চীনের ওয়ান রোড প্ল্যানও ভেস্তে যাবে। ফলে চীন রাশিয়ার পরাজয়ে উৎসাহী নয়।

বিঃ দ্রঃ লেখাটি ৩০ এপ্রিল ২০২২ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল

https://www.ajkerpatrika.com/182967/%E0%A6%8F-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%9B%E0%A7%81%E0%A6%87



 

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির উপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভূর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে...